গতি ছিল তাসকিন আহমেদের পরিচয়, তার অস্ত্র, তার ভয়ংকর সিগনেচার। এক সময় নতুন বল হাতে নিয়ে ছুটে আসা তাসকিনকে দেখলেই ব্যাটসম্যানের বুকে কাঁপন ধরত— ১৪০ কিলোমিটার পেরিয়ে মাঝেমধ্যে ১৫০ এর কাছাকাছি ছুঁয়ে ফেলা সেই গতি ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক বিরল বিলাসিতা।
কিন্তু এখন, একত্রিশ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে সেই তাসকিনকেই খুঁজে পাওয়া কঠিন। মাঠে যিনি নামছেন, তিনি গতির চেয়ে বেশি নির্ভর করছেন সহ্যশক্তির ওপর। কারণটা নিছক বয়স নয়— শরীরের ভেতরে চলা এক নীরব যুদ্ধ।
কাঁধে রয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ ছেঁড়া অংশ, যেখান থেকেই একজন ফাস্ট বোলার তার আসল শক্তি টেনে আনেন। পূর্ণ শক্তিতে বল করতে গেলেই সেই চোট জানান দেয় নিজের উপস্থিতি, লাগাম টানতে হয় গতিতে। চিকিৎসকদের মতে বড় অস্ত্রোপচার তাকে মাঠের বাইরে রাখতে পারে আট থেকে বারো মাস, তাও নিশ্চয়তা নেই পুরনো ছন্দ ফিরে পাওয়ার।

কাঁধ একা নয়— বাঁ পায়ের গোড়ালি আর অ্যাকিলিস টেন্ডনের নিচেও লুকিয়ে আছে অবাঞ্ছিত এক হাড়ের বৃদ্ধি, যা প্রতিবার ডেলিভারি স্ট্রাইডে পায়ের ভারী পতনে ব্যথা জাগিয়ে তোলে। ব্যথানাশক আর মাঝেমধ্যে ইনজেকশনই তাই এখন তার মাঠে টিকে থাকার গোপন সহযোদ্ধা। ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, একসময়ের ১৪৫ কিলোমিটার গতির বোলার এখন ঘোরাফেরা করছেন ১২৫-১৩৫ কিমির মধ্যে, গতির বদলে সুইং আর লাইন-লেংথের ওপর ভর করে টিকে থাকার চেষ্টায়।
আর এই সময়টাই সবচেয়ে নিষ্ঠুর। বাংলাদেশ ক্রিকেটে এখন পেস বোলিংয়ের এমন এক যুগ চলছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। নাহিদ রানার বলে ঘণ্টায় ১৫২ কিলোমিটার গতি ওঠে, বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
মাশরাফি, রুবেল কিংবা তাসকিন নিজেও কখনো এতটা ধারাবাহিকভাবে ১৪৫ ছাড়াতে পারেননি, কিন্তু রানা সেই ছবিটাই বদলে দিয়েছেন। তার সঙ্গে শরিফুল ইসলাম,এবাদত, হাসান মাহমুদ, মোস্তাফিজুর রহমান— সবাই মিলে গড়ে তুলেছেন এমন এক পেস আক্রমণ, যেখানে প্রতিটি আসনের জন্যই এখন কঠিন লড়াই।

মাশরাফি-পরবর্তী যুগে যেখানে তাসকিনই ছিলেন এই আক্রমণের মুখ, সেখানে আজ তার আশেপাশে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক প্রজন্ম, যারা প্রতিদিনই ছুটছে আরও বেশি গতিতে। তাসকিনের কমতে থাকা গতি তাই শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়— দলে তার জায়গা টিকিয়ে রাখার লড়াইয়েও অশনি সংকেত।
তবু তাসকিন থামছেন না, কারণ সামনে অপেক্ষা করছে ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ আর ২০২৮ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। এখনই অস্ত্রোপচারে গেলে ক্যারিয়ারের বড় অংশ হারানোর শঙ্কা, কিন্তু চোট বয়ে বেড়ালেও ঝুঁকি কম নয়। শরীর বাঁচিয়ে চললে হয়তো আরও কিছুদিন খেলা যায়, কিন্তু গতি ছাড়া এই নতুন প্রজন্মের ভিড়ে নিজের জায়গা ধরে রাখা যাবে তো? শরীর, সময় আর নতুন প্রজন্মের গতির সঙ্গে এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে জিতবে— তাসকিনের জেদ, নাকি তাকে ঘিরে ধরা এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা?












