মহাকাল, মনে রেখো

সবুজ গালিচায় ফুটবলের যে মহাকাব্য তিনি লিখে গেছেন, তার শেষ চরণে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে পুরো ক্রীড়াবিশ্ব। তবে এই বিদায় কোনো হারিয়ে যাওয়া নয় - এ যেন জাদুকরের স্বীয় সাম্রাজ্যে চিরস্থায়ী আসন গ্রহণ।

চলে যাওয়া মানেই অবসান নয়। কিছু প্রস্থান অমরত্বের সূচনা করে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের আঙিনা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিলেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। সবুজ গালিচায় ফুটবলের যে মহাকাব্য তিনি লিখে গেছেন, তার শেষ চরণে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে পুরো ক্রীড়াবিশ্ব। তবে এই বিদায় কোনো হারিয়ে যাওয়া নয় – এ যেন জাদুকরের স্বীয় সাম্রাজ্যে চিরস্থায়ী আসন গ্রহণ।

কিংবদন্তির সূচনা হয়েছিল এক সাধারণ শহরের ধুলোমাখা গলি থেকে। গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি কাটিয়ে যে পায়ের জাদুতে বিশ্বকে মোহিত করার স্বপ্ন বুনেছিলেন এক বালক, তা পরবর্তীতে বিশ্ব ফুটবলের ব্যাকরণই বদলে দেয়।

আলবিসেলেস্তেদের আকাশী-সাদা জার্সিতে তাঁর যাত্রাটা মোটেও গোলাপ বিছানো ছিল না। ব্যর্থতার মেঘ, হৃদভাঙা কান্না, আর একজাতির পাহাড়সম প্রত্যাশার চাপ – সবটাই সয়েছেন নীরবে। কিন্তু মহাকালের নিয়মে যিনি রাজা, তাঁকে তো শেষমেশ রাজমুকুট পরেই বিদায় নিতে হয়।

মারাকানার বিষাদ পেছনে ফেলে কোপা আমেরিকা জয়, ফিনালিসিমা আর অবশেষে লুসাইল স্টেডিয়ামে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কাতার বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি যখন তিনি দু’হাতে উঁচিয়ে ধরে চুমু এঁকে দিয়েছিলেন, তখনই ফুটবলের সবটুকু অর্জনের বৃত্ত পূর্ণ হয়েছিল।

জয় করার মতো আর কিছুই বাকি ছিল না তাঁর। তিনি যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চ ত্যাগ করলেন, তখনও তাঁর অবস্থান ফুটবলের সর্বোচ্চ চূড়ায়। পতন দেখে নয়, বরং রাজকীয় শীর্ষবিন্দুতে দাঁড়িয়েই তিনি টানলেন যবনিকাপাত।

মেসি ফুটবল খেলতেন না, যেন ক্যানভাসে কবিতা লিখতেন। বাম পায়ের সেই অনন্য স্পর্শ, চার-পাঁচজন ডিফেন্ডারকে ছলে-বলে পাশ কাটিয়ে বল জালে জড়ানোর সেই দৃশ্য – এ কেবল কোনো খেলা ছিল না, ছিল নিখাদ শিল্প।

ঘড়ির কাঁটা ঘুরবে, বিশ্বকাপ কিংবা কোপা আমেরিকার আসর আবার বসবে। আকাশী-সাদা দশ নম্বর জার্সি হয়তো নতুন কারও গায়ে উঠবে, কিন্তু সেই জার্সির ভেতরের মানুষটি, তাঁর হাঁটার ভঙ্গি, আর বল পায়ে সেই অলৌকিক মুহূর্তগুলো আর কখনো ফিরে আসবে না। তবে তিনি রেখে গেলেন এক অক্ষয় স্মৃতিস্তম্ভ।

​মেসির এই প্রস্থান কেবল একজন ফুটবলারের বিদায় নয়। এটি একটি যুগের ইতিবাচক পূর্ণতা। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবুজ ঘাস হয়তো আর তাঁর বুটের স্পর্শ পাবে না, কিন্তু হাজার বছর ধরে এই ধরণীতে যখনই ফুটবলের গল্প লেখা হবে – মেসির নাম উচ্চারিত হবে এক অবিনশ্বর জাদুকর হিসেবে।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link