ফুটবল দুনিয়ায় আজ অব্দি শত সহস্র কিংবদন্তির আগমন ঘটেছে। তাঁদের কেউ কেউ প্রাপ্তি আর অর্জনের দিক দিয়ে পৌঁছেছেন শিখরে, আবার কেউ কেউ রিক্ত হাতে টেনেছেন ক্যারিয়ারের যবনিকা! তবে, কিছু কিংবদন্তি এমনও আছেন, যাঁরা পারফরম্যান্স, খেলার ধরন আর ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে ইতিহাসে ঠাঁই করে নিলেও আজীবন কিছু ক্ষেত্রে অবহেলিত থেকে গেছেন সর্বদাই। আজকের গল্পটাও তেমনই একজনকে নিয়ে। যাঁর নাম, হ্যাভিয়ের জানেত্তি।
আর্জেন্টিনার বুয়েনোস আইরেসের এক অতি দরিদ্র পরিবারে ১৯৭৩ সালের ১০ আগস্ট জন্ম জানেত্তির। শৈশব থেকেই সংগ্রাম ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। বাবার সাথে ইটভাটায় কাজ করার পাশাপাশি কাজিনের সাথে শহরের অলিতেগলিতে দুধ ফেরি করে তিনি ছোট থেকেই পরিবারকে সহায়তা করতেন। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁর জন্মভূমিকে বিশ্বকাপ জিততে দেখার সোনালী স্মৃতিকে কোনো কিছুই মুছতে পারেনি তাঁর মগজ থেকে!
ফলে, ফুটবলের প্রতি অমোঘ আকর্ষণ থেকে কৈশোরে তিনি আর্জেন্টিনার বিভিন্ন ক্লাবে খেলতে ট্রায়াল দিতে শুরু করেন। প্রথমেই যান প্রখ্যাত ইন্দিপেন্দিয়েন্তে ক্লাবে। তাঁর বয়স তখন সবে ১৬। তবে, বিধি বাম! অত্যন্ত দুর্বল স্বাস্থ্যের দোহাই দিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে দেয় ক্লাবটি। এরপরও হাল ছাড়েননি জানেত্তি।

শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালে আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিভাগের দল অ্যাটলেটিকো টেলারসে ট্রায়াল দিয়ে নির্বাচিত হন তিনি। সেখানে অবশ্য খুব একটা নজর কাড়তে পারেননি জানেত্তি। পরে আর্জেন্টিনার আরও কয়েকটি ক্লাবে ঘুরে ১৯৯৩ সালে থিতু হন ব্যানফিল্ডে। এখানে এসেই তিনি ছড়াতে থাকেন তাঁর ফুটবলীয় রক্ষণের অনবদ্য দ্যুতি! সঙ্গে যোগ হয় মাঠজুড়ে ক্লান্তিহীনভাবে চষে বেড়ানোর অসামান্য কারিকুরি! তাই সমর্থকেরা ভালোবেসে তাঁকে ডাকতে শুরু করেন ‘এল ট্রাক্টর’!
ব্যস! ভাগ্যচক্রের গিয়ার বদলে যায় জানেত্তির। ব্যানফিল্ডে রক্ষণভাগে সফল ট্যাকলিং স্কিলস, অসাধারণ ইন্টারসেপশান আর ক্লিয়ারেন্সের নৈপুণ্যে ইউরোপের ক্লাবগুলোর নজরে আসেন তিনি। তারই সুবাদে ১৯৯৫ সালে ইতালিয়ান ক্লাব ইন্টার মিলানে যোগ দেন জানেত্তি।
এরপর থেকেই ইন্টার আর জানেত্তি হয়ে ওঠেন একে অপরের পরিপূরক! ক্লাবটিতে দীর্ঘ ১৯ বছর কাটান এই আলবিসেলেস্তে ডিফেন্ডার। ২০০০ সালের শুরুতে ক্লাবের চরম দুর্দিনে রিয়াল মাদ্রিদের মতো বিশ্বসেরা দলের প্রস্তাব পেয়েও স্রেফ ইন্টারের প্রতি ভালোবাসার কারণে তিনি রয়ে যান সান সিরোতে।

প্রতিদানও পান তিনি অবশ্য। নেরাজ্জুরিদের হয়ে রেকর্ড ৮৫৮টি ম্যাচ খেলা এই ডিফেন্ডার দেড় দশক ধরে নেতৃত্বের আর্মব্যান্ড পরেছেন নিজের বাঁ বাহুতে। ১৭ জন ভিন্ন কোচের অধীনে খেললেও সবার কাছেই প্রিয় ‘এল কাপিতানো’ বা কাপ্তান ছিলেন একজনই। সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রা আর পরিপাটি চুলের সেই হ্যাভিয়ের জানেত্তি!
এত আলাদা আলাদা কোচের অধীনে খেলার কারণে আরেকটা অনন্য বৈশিষ্ট্য গড়ে ওঠে এই আর্জেন্টাইনের খেলায়। ভিন্ন ভিন্ন গুরুদের ভিন্ন ভিন্ন ট্যাকটিক্সে কখনো রাইট ব্যাক, কখনো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, আবার কখনো সেন্টারব্যাকের ভূমিকায় থাকার কারণে মাল্টিফাংশনাল খেলোয়াড়ে পরিণত হন জানেত্তি। যা তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে প্রায়শই প্লেমেকার বানিয়ে দিত!
ইন্টার মিলানে তিনি ১৬টি ট্রফি জয় করেন, যার ১৫টিই তাঁর অধিনায়কত্বে। জানেত্তির ইন্টার অধ্যায়ের স্বর্ণালি বছরটা ছিল ২০১০। সে বছর ক্লাবটির হয়ে ট্রেবল জয়ের স্বাদ পান তিনি।

আরেকটি অনন্য নজির গড়ার সঙ্গেও মিশে আছে জানেত্তির নাম। ফুটবলের প্রথাগত ডিফেন্ডাররা প্রায়শই রাফ ট্যাকল, আগ্রাসী আচরণ এবং প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে লাল কার্ড পেতে সিদ্ধহস্ত হলেও, জানেত্তি তাদের কাতারে ছিলেন না। তাই, অমায়িক চরিত্র ও মার্জিত আচরণের এই মানুষটা দুই দশকেরও বেশি সময় রক্ষণভাগে খেলে মোটে দুবার সেন্ট অফ হয়েছিলেন!
অথচ ইন্টারের এই অবিসংবাদিত নায়কের জাতীয় দলের অধ্যায়টা ছিল চরম আক্ষেপে মোড়া। তবে, শুরুটা ছিল নির্লিপ্তভাবেই। ১৯৯৪ সালে ২১ বছর বয়সে ড্যানিয়েল প্যাসারেলার অধীনে জাতীয় দলে অভিষেক হলেও বৈশ্বিক মঞ্চে তিনি নিজের জাত চেনান ১৯৯৮ বিশ্বকাপে। ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হওয়া ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে যখন ম্যাচে টানটান উত্তেজনা, ঠিক তখনই ফ্রি-কিক থেকে হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরনের বাড়ানো পাসে এক অসাধারণ বাঁ-পায়ের জোরালো শটে ২-২ সমতা এনেছিলেন এই ডিফেন্ডার।
২০০২ বিশ্বকাপে না খেললেও ২০০৬ বিশ্বকাপের আগে ক্লাব পর্যায়ে দুর্দান্ত ফর্মের কারণে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের দায়িত্ব কাঁধে নিতে প্রস্তুত ছিলেন জানেত্তি। কিন্তু আক্ষেপ আর অবহেলা ছাড়া কিছুই মেলেনি সেবার তাঁর। কোচ হোসে পেকারম্যান কোনো এক অদ্ভুত অজানা কারণে তাঁকে স্কোয়াডে রাখেননি। অথচ তাঁর জায়গায় সুযোগ পাওয়া গ্যাব্রিয়েল হেইনৎস প্রায় পুরো সিজন ইনজুরির কারণে ডাগআউটেই কাটিয়েছিলেন।

তবে, জানেত্তি এর চেয়েও বড় অবিচার পান ২০১০ বিশ্বকাপে। সে বছর ইন্টারকে স্বপ্নের ট্রেবল জিতিয়ে ৩৬ বছর বয়সে ক্যারিয়ারের চূড়ায় থাকলেও আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ও কোচ দিয়েগো ম্যারাডোনা তাঁকে বিশ্বকাপের স্কোয়াডে নেননি! “জানেত্তি বুড়িয়ে গেছেন” বলে তাঁর বদলে নিকোলাস ওতামেন্ডিকে খেলানোর মাশুলও ম্যারাডোনা দেন কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ পরাস্ত হয়ে।
আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির কাছ থেকে এত বড় উপেক্ষার পরও জানেত্তি ছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের শান্ত। তিনি কোনো ক্ষোভ না উগরে হেসে বলেছিলেন, “আফসোসের কিছু নেই। আমি টিভিতেই আর্জেন্টিনার খেলা দেখব আর সমর্থন করব, দলের পাশে থাকব।”
অনন্য ব্যক্তিত্বের এই আলোতেই যেন চরম উপেক্ষাকে হাসিমুখে জয় করে ফুটবল বিশ্বকে এক পরম ভালোবাসার ঋণে বেঁধে গেছেন হ্যাভিয়ের জানেত্তি। নিজের সেরা সময়ে জাতীয় দলে সুযোগ না পেয়েও দেশের হয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৪৫টি ম্যাচ খেলা ফুটবলার তাই তিনিই। একারণে, জানেত্তি অবহেলিত হতে পারেন, কিন্তু তাঁর অনন্য বীরত্বগাঁথা আর ব্যক্তিত্বের মাধুর্য ফুটবলের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান থাকবে, এ কথা বলাই বাহুল্য!











