সেনা দেশে জিততেই ভুলে গেছে পাকিস্তান!

বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তলানিতে পড়ে থাকা এই দলটার প্রতিটা হারই যেন পুরনো ক্ষততে নতুন করে নুন ছিটানো। কারণ সেনা দেশে, মানে দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ায়, ২০১৮ সালের পর থেকে পাকিস্তান যেন এক ভাঙা রাজ্যের শেষ প্রহরী, যুদ্ধ করে যাচ্ছে কিন্তু জয় পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

লর্ডসের বাইশ গজে যখন শেষ উইকেটটা পড়ল, স্কোরবোর্ডে তখন ১৯৪ রানের হার লেখা, আর গ্যালারিতে নেমে আসা নীরবতাটা যেন পাকিস্তান ক্রিকেটের গত আট বছরের এক দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি। লিডসে ইনিংস ব্যবধানে বিধ্বস্ত হয়ে সিরিজ শুরু, তারপর লর্ডসে আরেকবার নতজানু হওয়া — বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তলানিতে পড়ে থাকা এই দলটার প্রতিটা হারই যেন পুরনো ক্ষততে নতুন করে নুন ছিটানো। কারণ সেনা দেশে, মানে দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ায়, ২০১৮ সালের পর থেকে পাকিস্তান যেন এক ভাঙা রাজ্যের শেষ প্রহরী, যুদ্ধ করে যাচ্ছে কিন্তু জয় পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঁচ ম্যাচের পাঁচটাতেই হার, মাত্র একটা লড়াই একটুখানি জমেছিল, বাকিগুলো নিছক আত্মসমর্পণ। অস্ট্রেলিয়ায় একই চিত্র — পাঁচে পাঁচ, আর ১৯৯৫ সালের পর থেকে সেখানে একটা টেস্ট তো দূরের কথা, একটা সিরিজও জেতা হয়নি, যেন তিন দশকের অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে দলটা। নিউজিল্যান্ডে সবশেষ সফরে দুই ম্যাচের একটা ছিল রোমাঞ্চকর থ্রিলার, আরেকটায় প্রতিপক্ষ হেসেখেলে জিতেছিল। শুধু ইংল্যান্ডেই একটুখানি ব্যতিক্রম — ২০১৮ সালে লর্ডসে সেই স্মরণীয় জয়টা যেন শেষবারের মতো জ্বলে ওঠা প্রদীপ। তারপর সাউদাম্পটনে দুটো ড্র আর একটা তিন উইকেটের হার পেরিয়ে এখন শুধুই পতনের ধারাবাহিকতা। লর্ডস আর লিডস মিলিয়ে পুরো নব্বই ওভারও ব্যাট করতে পারেনি পাকিস্তান, যেন প্রতিরোধের ভাষাটাই তারা হারিয়ে ফেলেছে।

কিন্তু এই সংকটের সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়টা লেখা হয়েছে বিদেশের মাটিতে নয়, নিজেদের ঘরের উঠোনে। বাংলাদেশের বিপক্ষে ঘরের মাঠে হোয়াইটওয়াশ হওয়াটা ছিল আত্মমর্যাদার ওপর গভীর আঘাত। যে দল একসময় নিজেদের কন্ডিশনে অপ্রতিরোধ্য বলে পরিচিত ছিল, সেই মাটিতেই বাংলাদেশের কাছে ধবলধোলাই হওয়াটা প্রমাণ করে সমস্যাটা শুধু কন্ডিশন-নির্ভর নয়, মজ্জাগত। এই হারই আসলে শান মাসুদের অধিনায়কত্বের শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিল, বোর্ডকে বাধ্য করেছিল আবার বাবর আজমের দিকে ফিরে তাকাতে। যে সংকট সেনা দেশে বছরের পর বছর ফুটে উঠছে, তার শিকড় আসলে ঘরের মাঠ পর্যন্ত বিস্তৃত।

নেতৃত্বের চেয়ারটা এই সময়ে ঘুরেছে চড়কির মতো। ২০২৩ সালে বাবর সরে দাঁড়ালেন, নেতৃত্ব পেলেন মাসুদ। ষোলো টেস্টের বারোটাতেই হেরে তার অধ্যায় শেষ হলো সেই বাংলাদেশ-বিপর্যয়ে। বোর্ড আবার ফিরে গেল পুরনো ভরসায়, বাবরকে ফিরিয়ে আনল অধিনায়কের আর্মব্যান্ডে। কিন্তু চেয়ারে বসা মানুষ বদলালেও মাঠের চিত্রনাট্য বদলায়নি এতটুকু। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যে সামান্য স্বস্তি মিলেছিল, ইংল্যান্ডে এসে সেটাও উবে গেছে।

আসল সংকটটা কোথায়? পেসার মোহাম্মদ আব্বাস নিজেই যা বলেছেন, তাতে পরিষ্কার — এটা একজন-দুজনের ব্যর্থতা নয়, গোটা কাঠামোর ফাটল। ক্যাচ ফসকে প্রতিপক্ষকে বাড়তি সত্তর রান উপহার দেওয়া, তিন বিভাগেই ধারাবাহিকতার অভাব, আর পেস আক্রমণে অভিজ্ঞতার চরম ঘাটতি। মোহাম্মদ আলী কিংবা খুররম শাহজাদের মতো তরুণরা ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতিশ্রুতিশীল হলেও, আন্তর্জাতিক আঙিনায় ভিন্ন কন্ডিশনে বল করার পরীক্ষাটা তাদের এখনও দেওয়া হয়নি। আব্বাস একা নয়টা উইকেট নিয়ে লর্ডসে প্রথম পাঁচ উইকেট শিকার করেও দলকে জেতাতে পারেননি, কারণ চারপাশের ভিত্তিটাই নড়বড়ে।

তাহলে অধিনায়ক বদলে, পুরনো মুখ ফিরিয়ে এনেও, ঘরের মাঠে অপমানিত হয়েও যে সংকট মেটেনি, সেটা কি সত্যিই নেতৃত্বের ব্যর্থতা, নাকি এটা এমন এক কাঠামোগত ধস, যা কোনো একজন অধিনায়কের একার পক্ষে সামলানো সম্ভবই নয়?

লেখক পরিচিতি

আমজাদ হোসেন আবির

সাব এডিটর

Share via
Copy link