পিন্ডির বুকে অমর মহাকাব্যের পূর্ণতা!

চারপাশের বাতাসে ভাসছিল একটাই প্রশ্ন - বাংলাদেশ কি পারবে ইতিহাস গড়ে পাকিস্তানকে তাদেরই মাটিতে হোয়াইটওয়াশ করতে?

প্রথম টেস্ট জয়ের সেই উৎসবের রেশ তখনো মেলায়নি। সেকেন্ড টেস্টের সকালে রাওয়ালপিন্ডিতে যখন সূর্য উঠল, চারপাশের বাতাসে ভাসছিল একটাই প্রশ্ন – বাংলাদেশ কি পারবে ইতিহাস গড়ে পাকিস্তানকে তাদেরই মাটিতে হোয়াইটওয়াশ করতে? পিন্ডির আকাশ সেদিন মেঘে ঢাকা, আর মাটি যেন এক নতুন রূপকথার নীরব সাক্ষী।

প্রথম দিনটা গিলে খেল বৃষ্টি। কিন্তু আসল নাটক আর ট্র্যাজেডি ডানা মেলল ম্যাচের তৃতীয় প্রভাতে। ​সকালের ভেজা বাতাসে বল হাতে আগুন ঝরাতে লাগলেন খুররম শাহজাদ আর মির হামজা। তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে লাগল বাংলাদেশের ব্যাটিং দুর্গ।

স্কোরবোর্ডে মাত্র ২৬ রান, অথচ সাজঘরে ফিরে গেছেন ছয় জন ব্যাটার! চরম অন্ধকার আর ধ্বংসস্তূপের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তখন বাংলাদেশ। ঠিক তখনই মঞ্চে আবির্ভাব দুই কাণ্ডারীর।লিটন দাস এবং মেহেদী হাসান মিরাজ।

তাঁদের সেই প্রতিরোধ কোনো সাধারণ ব্যাটিং ছিল না, তা ছিল যেন বিপদের মুখে আঁকা এক বিদ্রোহী ছবি। মিরাজ এক প্রান্তে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন ধীরস্থিরতায়, আর অন্য প্রান্তে লিটনের ব্যাট থেকে ঝরতে লাগল বিশুদ্ধ কবিতা।

লিটন যখন ১৩৮ রানের সেই মহাকাব্যিক ইনিংসটি উপহার দিয়ে মাঠ ছাড়ছেন, বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে তখন ২৬২ রান। ২৬ রানে ছয় উইকেট হারানোর পর এমন প্রত্যাবর্তন! ক্রিকেটের ঈশ্বরও বোধহয় সেদিন স্তব্ধ হয়ে দেখেছিলেন।

এরপরের দৃশ্যপট আগুনের গতিতে আঁকা। তরুণ নাহিদ রানা যখন ১৪৫+ কিলোমিটার গতিতে বাউন্সার ছুঁড়ছিলেন, পাকিস্তানি ব্যাটারদের চোখেমুখে তখন শুধুই দিশেহারা ভাব। হাসান মাহমুদের বিধ্বংসী স্পেলে ১৭২ রানেই গুটিয়ে গেল পাকিস্তান। টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো ইনিংসে বাংলাদেশের পেসাররাই নিলেন প্রতিপক্ষের দশটি উইকেট।

শেষ দৃশ্যে জয়ের জন্য ১৮৫ রানের টার্গেট। জাকিরের ঝড়ো সূচনা আর শান্ত-মুমিনুলের স্থিরতার পর ক্রিজে এসে দাঁড়ালেন দুই পুরনো সৈনিক – মুশফিকুর রহিম আর সাকিব আল হাসান। আবরারের বলটি যখন সাকিবের ব্যাটের কোণে লেগে এক্সট্রা কাভার সীমানা স্পর্শ করল, রাওয়ালপিন্ডিতে তখন ইতিহাসের গর্জন।

​বাংলাদেশ জয়ী ছয় উইকেটে। পাকিস্তানের মাটিতে তাদের ২-০ ব্যবধানে ‘বাংলাওয়াশ’ করার রূপকথা পূর্ণতা পেল।

​সাকিবের ব্যাটের সেই শেষ ছোঁয়ায় রাওয়ালপিন্ডির নীরবতা চুরমার হয়ে ভেসে গেল এক অলৌকিক সুরতরঙ্গে। এ তো কেবল ক্রিকেটীয় স্কোরবোর্ডের কোনো পাটিগণিত ছিল না, ছিল পিন্ডির বুকে ঝরে পড়া এক ফোঁটা অশ্রুর রক্তগোলাপ হয়ে ফুটে ওঠার গল্প। বিষাদের কুয়াশা চিরে যে অপরাজেয় সূর্যের জন্ম হলো, তা পাকিস্তানের মাটিতে লাল-সবুজের অহংকারকে চিরকালের জন্য এক অমর নক্ষত্রের মতো বসিয়ে দিল মহাকালের বুকে।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link