ডেভ হোয়াটমোর ও নস্টালজিক ১৯৯৬!

শ্রীলঙ্কা দল লাহোর থেকে দেশে ফেরা পর কলম্বো এয়ারপোর্টে ছিল জনতার ঢল। বিমানবন্দর থেকে প্রেসিডেন্টের বাসভবন পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য। লাখ লাখ মানুষ অভিনন্দন জানাতে রাস্তায় নেমে এসেছিল। মানুষের এই আবেগঘন আনন্দের উপলক্ষ এনে দেওয়া মানুষটি সেদিন খুব বেশি নজরে আসেননি কারো। আসলে ডেভ হোয়াটমোরের চরিত্রটাই তো এমন। তিনি বরাবরই তো আড়ালের নায়ক। সেদিন যেমন ছিলেন শ্রীলঙ্কার হয়ে, পরে ছিলেন বাংলাদেশের জন্য।

১৯৯৬ সালের ১৭ মার্চ লাহোরের গাদ্দাফী স্টেডিয়ামে ক্রিকেট ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় রচিত হয়েছিল। সেদিন যখন ট্রফি হাতে মাঠে দৌঁড়াতে থাকা অর্জুনা রানাতুঙ্গাকে খুঁজছিল ফটোগ্রাফারদের লেন্স – তখন সেই উদযাপনের মঞ্চে কাঁচাপাকা চুলের নিপাঁট ভদ্রলোককে খুঁজে পাওয়া মুশকিল ছিল।

শ্রীলঙ্কা দল লাহোর থেকে দেশে ফেরা পর কলম্বো এয়ারপোর্টে ছিল জনতার ঢল। বিমানবন্দর থেকে প্রেসিডেন্টের বাসভবন পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য । লাখ লাখ মানুষ অভিনন্দন জানাতে রাস্তায় নেমে এসেছিল। মানুষের এই আবেগঘন আনন্দের উপলক্ষ এনে দেওয়া মানুষটি সেদিন খুব বেশি নজরে আসেননি কারো।

আসলে ডেভ হোয়াটমোরের চরিত্রটাই তো এমন। তিনি বরাবরই তো আড়ালের নায়ক। সেদিন যেমন ছিলেন শ্রীলঙ্কার হয়ে, পরে ছিলেন বাংলাদেশের জন্য।

গল্পটা একদম শুরু থেকেই বলা যাক।

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে মাত্র সাত টেস্ট এবং একটি ওয়ানডে খেলা ডেভ ১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। এরপর কোচের ভূমিকায় অবতীর্ণ হোন সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ারের সাবেক এই অজি ক্রিকেটার। দুই মেয়াদে শ্রীলঙ্কা দলকে সার্ভিস দেন। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে তার ক্যারিশমাটিক পেশাদারিত্বে আন্ডারডগ একটা দলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বানান। ডেভ হোয়াইটমোরের গেম প্ল্যানের কাছে বড় বড় ক্রিকেট পরাশক্তিও সেই বিশ্বকাপে নাস্তানাবুদ হয়েছে আনকোরা লঙ্কানদের কাছে।

শেষটা হয়েছিল লাহোরের সেই ফাইনাল দিয়ে। সেদিনের ঐতিহাসিক  অধ্যায় বদলে দিয়েছিল একটা দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি। ক্রিকেটের পৃথিবীবে বড় শক্তির তকমা পেয়েছিল লঙ্কানরা। বিশ্বকাপের আগে যে দলকে কেউই ধর্ত্যব্যের মধ্যে আনেনি তারাই কিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।  ঊনবিংশ শতাব্দির পরিচিত ব্র্যান্ড উইলস সেবার বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো পৃষ্ঠপোষক হয়। তাই বিশ্বকাপের নামকরণ হয়েছিল, ‘উইলস ওয়ার্ল্ড কাপ।’ এই উইলস ওয়ার্ল্ড কাপের চ্যাম্পিয়ন দলের নাম শ্রীলঙ্কা।  শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ জয় এখমও ক্রিকেটের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর গল্পগুলোর একটি।

প্রথমবারের মত তিন দেশ মিলে আয়োজন করে বিশ্বকাপ।  ভারত, পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কা। তবে স্বাগতিকের স্বাদ শ্রীলঙ্কা যে সবেচেয়ে কম পেয়েছে  এক কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। পুরো বিশ্বকাপ ট্যুর্নামেন্ট মাত্র চারটি ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল শ্রীলঙ্কায়। কেননা ট্যুর্নামেন্ট শুরুর অল্প কিছু দিন আগেই কলম্বোর সেন্ট্রাল ব্যাংকের সামনে তামিল টাইগারদের বোমা বিস্ফোরণে হতাহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িতে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে লংকান সরকার সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও অস্ট্রেলিয়া এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। তাই চারটি ম্যাচ হওয়ার কথা থাকলেও হল মাত্র দুটি। আর ট্যুর্নামেন্টের বাইলজ অনুযায়ী সেই দুটি ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে জয়ী ঘোষণা করা হয়।

শুরু থেকেই  সবার নজর কারে ওপেনিংয়ে সনাৎ জয়সুরিয়া আর রমেশ কালুভিতারানার পিঞ্চ হিটিং আর লঙ্কানদের আগ্রাসী মনোভাব। তবে লঙ্কানদের শক্তির সবচেয়ে বড় জায়গা ছিল একটাই- সাহস আর আত্মবিশ্বাস। আর এর সবটুকুই ছড়িয়ে দিয়েছিলেন দলের সেনাপতি অর্জুনা রানাতুঙ্গা।

শেষ বল পর্যন্ত দাতে দাত চেপে, চোখে চোখ রেখে লড়াই করার মানষিকতায় তাদের অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে ৯৬ বিশ্বকাপে। গ্রুপপর্বে ভারত, জিম্বাবুয়ে আর কেনিয়ার বিপক্ষে জিতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে শ্রীলঙ্কা। প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড। টসে জিতে শুরুতে ব্যাট করে ২৩৫ রান বোর্ডে তোলে ইংলিশরা। তখনকার বিবেচনায় ২৩৫ রান রীতিমতো  চ্যালেঞ্জিং স্কোর। তবে জয়সুরিয়ার ৪৪ বলে ৮২ রানের ঝড়ে স্রেফ উড়ে যায় ইংল্যান্ড ৫ উইকেটের জয় নিয়ে সেমিফাইনালে উঠে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা।

সেমিতে ভারত ও শ্রীলঙ্কার ঐতিহাসিক ম্যাচটি হয় ইডেন গার্ডেন্সে। ডি সিলভার  ৪৭ বলে ৬৬ আর শেষ দিকে চামিন্দা ভাসের ২৩ রানের  ক্যামীয়তে ২৫১ রানের পুঁজি পায়। লক্ষ্য তারা করতে নেমে শচীনের ব্যাটে ভর করে ভালমতোই  এগোচ্ছিল ভারত।  তবে ৬৫ রান করে শচীনের আউটের পর দৃশ্যপটে আকষ্মিক মোচড়।   ৯৮ থেকে ১২০ রানে যেতে ভারত হারায় ৬ উইকেট। শ্রীলঙ্কার জয় তখন সময়ের ব্যাপার।

এ সময়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠে গোটা ইডেন। আগুন জ্বালিয়ে ঘরের ছেলেদের পারফরম্যান্সের প্রতিবাদ করে সমর্থকরা। শ্রীলঙ্কা এমন পরিস্তিতিতে ম্যাচ খেলতে অস্বীকৃতি জানায় এবং ম্যাচ রেফারি ক্লাইভ লয়েড তাদের জয়ী ঘোষণা করে।  ফাইনালে অজিদের বিপক্ষে আবারো ত্রাতার ভূমিকায় ‘ম্যাড ম্যাক্স’ খ্যাত অরবিন্দ ডি সিলভা।

অজিদের দেওয়া ২৪১ রান তাড়া করতে নেমে সেমিফাইনালের মত ফাইনালের ভাল শুরু এনে দিতে ব্যর্থ  দুই ওপেনার জয়সুরিয়া আর কালুভিতারানা।   ২৩ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পরে যায় শ্রীলঙ্কা। পরের তিন ঘন্টা শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ইতিহাসেরই সবেচেয়ে মূল্যবান ইনিংসটি খেললেন ডি সিলভা। ১৩ চারে অপরাজিত ১০৭ করে দলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে মাঠ ছেড়েছেন সেমিফাইনাল আর ফাইনলের নায়ক ডি সিলভা।

জেতার পর উল্লাসে ফেটে পড়েছিল পুরো শ্রীলঙ্কা। রাতে রাজধানী কলম্বো এবং অন্যান্য শহরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিজয় উল্লাস করেছিল। শ্রীলঙ্কায় তখন গৃহযুদ্ধ চলছিল। বিদ্রোহী তামিল টাইগারদের হামলার ভয়ে রাত নয়টার মধ্যে মানুষ ঘরের বাইরে তেমন থাকতো না। কিন্তু সেই রাতে শ্রীলঙ্কানরা সেই ভয়-শঙ্কা অতিক্রম করেছিল।

ম্যাচের পর সেই রাতেই লাহোরে  হোটেল রুমে  কোচ ডেভ হোয়াটমোর শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে একটি ব্যক্তিগত অভিনন্দন বার্তা পেয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট লেখেন, ‘দলের এ সাফল্যে দেশ যারপরনাই গর্বিত।’  প্রেসিডেন্টের কাছে অভিনন্দন বার্তা হোয়াইটমোরের আসলে প্রাপ্য ছিল। এই সাফল্যের নেপথ্যের সবচেয়ে বড় কারিগর তো তিনিই।

হোয়াটমোর এসে দলে শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব, ফিটনেসের দিকে জোর দেন। প্রতিটি ম্যাচের আগে এবং পরে তা নিয়ে বিস্তর বিশ্লেষণ শুরু হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে একবার বলেছিলেন, ‘ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষ দল নিয়ে চুল-চেরা বিশ্লেষণ করা হতো। পুরনো ভিএইচএস টেপে রেকর্ড করা ভিডিও ফুটেজ চালিয়ে প্রতিপক্ষের ক্রিকেটারদের শক্তি এবং দুর্বলতা নিয়ে কথা হতো। প্রতিটি প্রতিপক্ষ দল নিয়েই আমরা এটা করতাম।’

অজিদের বিপক্ষে ফাইনালের আগে ডেভ তার দলকে শুধু বলেছিলেন, ‘মনোযোগ ধরে রাখ, নিয়ন্ত্রণ হারিও না’ গুরুর কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন ডি সিলভা আর তাতেই ইতিহাস। গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত শ্রীলঙ্কার জন্য একটা আর্শীবাদ হয়ে এসেছিলেন ডেভ হোয়াইটমোর। আর সেই আশীর্বাদেই আসে বিশ্বকাপ!

আর সেই আশীর্বাদেই পরবর্তীতে বাংলাদেশ দলের সাফল্যের কান্ডারিও হন তিনি। প্রথম সিরিজ জয়, কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো, ২০০৭ বিশ্বকাপের সুপার এইটের টিকেট পাওয়া – হোয়াটমোর জমানায় বাংলাদেশের সাফল্যের খাতাটাও নেহায়েৎ কম নয়!

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...