ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অন্তিম বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণতা পেল এক পরম শূন্যতার। যে শূন্যতায় হারিয়ে গেল সমসাময়িক ফুটবলের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য ত্রয়ী। লিওনেল মেসি, নেইমার জুনিয়র এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তাদের এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটল আস্ত এক ফুটবলীয় সভ্যতার, যে সভ্যতার আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল গোটা একটি প্রজন্ম।
ফুটবল তো কেবল ঘাসের গালিচায় চামড়ার গোলক ছোড়ার নিছক কোনো প্রতিযোগিতা নয়। এটি মানুষের আবেগ, চোখের জল, দীর্ঘশ্বাস আর অনন্ত উদযাপনের মহাকাব্য। আর এই মহাকাব্যের গত দুই দশকব্যাপী অধ্যায়গুলো রচিত হয়েছিল এই তিন মহারথীর জাদুকরি পায়ে। সময়ের স্রোতে তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বটে, কিন্তু ইতিহাসের শাশ্বত ক্যানভাসে তারা আজ এক অবিচ্ছেদ্য ঐকতান।
পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ছিলেন অপ্রতিরোধ্য সংকল্প ও জেদের মূর্ত প্রতীক। কালকে যিনি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে ঝড় তুলেছেন, গোলকে যিনি বানিয়েছিলেন নিজের একচ্ছত্র উপত্যকা। তাঁর বিদায় মানে মানবীয় সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানোর অদম্য স্পৃহার এক পরম ইতিকথা।

অন্যদিকে, লিওনেল মেসি ছিলেন সবুজ গালিচার কবি। তাঁর পায়ে বল পড়া মানেই ছিল রূপকথার পাতা খুলে যাওয়া। সহজাত প্রতিভা আর নান্দনিকতার এমন সুনিপুণ বুনন ফুটবল বিশ্ব এর আগে দেখেনি, যার পরিপূর্ণতা পেয়েছিল তাঁর বিশ্বজয়ী হাতের স্পর্শে।
আর এই ত্রয়ীর সাম্বা সুরটি বাজাতেন নেইমার জুনিয়র। ব্রাজিলের এই রাজপুত্রের খেলায় মিশে ছিল দক্ষিণ আমেরিকার উদ্দাম হাওয়া, হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেওয়া ড্রিবলিংয়ের মোহ এবং শৈল্পিক আনন্দের নিখুঁত পসরা।
এই ত্রয়ী কেবল ইতিহাস কিংবা রেকর্ডের খাতা ভারী করেননি, তারা কোটি কোটি মানুষের মনোজগতে বুনে দিয়েছিলেন এক মায়াবী আসক্তি। তাদের দ্বৈরথ দেখতে মধ্যরাতের চাদর মুড়ি দিয়ে জেগে থাকত পুরো পৃথিবী। আজ যখন একে একে মেসি, নেইমার ও রোনালদো আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে নিজেদের পা গুটিয়ে নিলেন, তখন মনে হচ্ছে ফুটবলের বুক থেকে যেন এক বিশাল উষ্ণতা হারিয়ে গেল।

আন্তর্জাতিক গ্যালারির শূন্য হয়ে যাওয়া নীলচে আলোয় আর তাদের পায়ের চেনা ছন্দ বাজবে না। তবে তারা যখন সবুজ আঙিনা থেকে একে একে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন, তখন ঘাসের প্রতিটি ব্লেডে খোদাই হয়ে রইল এক সুদীর্ঘ রূপকথা। যুগ বদলাবে, নতুন পায়ে ফুটবল গড়াবে ঠিকই, কিন্তু ত্রিমূর্তির এই স্বর্ণালী উপাখ্যান মানুষের স্মৃতির অতল গহ্বরে চিরকাল জেগে রবে এক অবিনশ্বর ইতিকথা হয়ে।











