পঙ্গু পা নিয়েও হিমালয় স্পর্শ করা যায়

হ্যামস্ট্রিংয়ের তীব্র ব্যথায় প্রতি পদক্ষেপে যিনি কাতরাচ্ছেন, সেই পঙ্গু শরীর নিয়েই ম্যাক্সওয়েল শুরু করলেন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম অবিশ্বাস্য, মহাকাব্যিক এক লড়াই। দৌড়ানোর শক্তি নেই তো কী হয়েছে? স্থির পায়ে দাঁড়িয়েই যিনি চার-ছক্কার ফুলঝুরিতে লিখে ফেললেন অমরত্বের ইশতেহার।

২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর। মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের স্কোরবোর্ডে জ্বলজ্বল করছিল এক চরম বিপর্যয়ের ছবি। ৯১ রানে সাত উইকেট হারিয়ে তখন ধুঁকছে অস্ট্রেলিয়া। জয় থেকে তখনও বহু দূরে, পরাজয়ের প্রহর গুণছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ডাগআউটে উৎকণ্ঠা, গ্যালারিতে নি:শব্দ নিরাশা। ঠিক তখনই বাইশ গজে পা রাখলেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল।

হ্যামস্ট্রিংয়ের তীব্র ব্যথায় প্রতি পদক্ষেপে যিনি কাতরাচ্ছেন, সেই পঙ্গু শরীর নিয়েই ম্যাক্সওয়েল শুরু করলেন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম অবিশ্বাস্য, মহাকাব্যিক এক লড়াই। দৌড়ানোর শক্তি নেই তো কী হয়েছে? স্থির পায়ে দাঁড়িয়েই যিনি চার-ছক্কার ফুলঝুরিতে লিখে ফেললেন অমরত্বের ইশতেহার।

ওয়াংখেড়ের বাইশ গজ সেদিন রূপ নিয়েছিল এক রণাঙ্গনে, যেখানে প্রতিপক্ষ শুধু আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রিত বোলিং আক্রমণ নয়। খোদ নিজের বিদ্রোহী শরীরও। একে একে সাজঘরে ফিরে গেছেন ট্রাভিস হেড, ডেভিড ওয়ার্নার, মিচেল মার্শরা। স্কোরবোর্ডে ৯১ রান তুলতেই টপ ও মিডল অর্ডারের মেরুদণ্ড ভেঙে চুরমার।

উইকেটে এসে প্যাট কামিন্সকে সঙ্গে নিয়ে ম্যাক্সওয়েল যখন প্রতিরোধের চেষ্টা করলেন, তখন থেকেই ক্র্যাম্পের ছোবল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রান নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, একটি সিঙ্গেলের জন্য দৌড়ানোর ন্যূনতম শক্তিটুকুও নেই পায়ে। কিন্তু ক্রিকেটের এই জাদুকর তো হার মানার ধাতুতে গড়া নন।

​যত সময় গড়াল, ব্যথার তীব্রতা ততই বাড়ল। আর উইকেটে পাথরের মতো অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে ম্যাক্সওয়েল বেছে নিলেন এক ধ্বংসাত্মক পথ – ‘দৌড়াব না, কেবল পাঠাব সীমানার বাইরে।’

এই মহাকাব্যিক ইনিংসে ম্যাক্সওয়েলের নি:শব্দ সারথি ছিলেন অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ৬৮ বলে অপরাজিত ১২ রানের এক অত্যন্ত সংযত ইনিংস খেলে কামিন্স প্রমাণ করলেন, রূপকথা লেখার জন্য একজন নিবেদিতপ্রাণ সহযোগীর কতটা প্রয়োজন।

মুজিব উর রহমান, রশিদ খান ও নূর আহমেদদের মতো বিশ্বমানের স্পিনারদের সামনে ওয়াংখেড়ের উইকেটে দাঁড়ানোই যেখানে দায়, সেখানে ম্যাক্সওয়েল চালালেন এক অবিশ্বাস্য ধ্বংসযজ্ঞ। সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পেরে প্রায় এক পায়ে ভর দিয়ে তিনি রিভার্স সুইপ, লফটেড ড্রাইভ আর ওভার বাউন্ডারির ফুলঝুরি ছোটালেন। বোলারের নাম কিংবা ফিল্ডিং প্লেসমেন্ট – কোনোটার দিকেই তখন তাঁর ভ্রুক্ষেপ ছিল না। তাঁর দৃষ্টি যেন আটকে ছিল কেবল ওই সীমানার ওপারে।

শেষ পর্যন্ত সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে স্কোরবোর্ডে নিজের নামটা ঠিকই সোনা দিয়ে লিখিয়ে নেন ম্যাক্সওয়েল। ১২৮ বলে অপরাজিত ২০১ রানের এই ইনিংসটি কেবল একটি ডাবল সেঞ্চুরি নয়। এটি ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও মানসিকভাবে সবচেয়ে কঠিন এক লড়াইয়ের দলিল। ২১টি চার এবং দশটি গগনচুম্বী ছক্কায় সাজানো সেই ইনিংসের প্রতিটি শট যেন ছিল যন্ত্রণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা।

​মুম্বাইয়ের সেই সন্ধ্যায় গ্লেন ম্যাক্সওয়েল শুধু একটি ম্যাচ জেতাননি, তিনি ক্রিকেটপ্রেমীদের উপহার দিয়েছিলেন এমন এক অমর রূপকথা। যা যুগ যুগ ধরে অনুপ্রেরণা জোগাবে হার না মানা যেকোন লড়াকু আত্মাকে।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link