রোদে পুড়লেন, ঘামে ভিজলেন। শর্টবলের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। ফিজিও এলেন। তবুও তাওহীদ উঠে দাঁড়ালেন, মাথা উঁচু করলেন। চোখ রাঙালেন, ব্যাট হাতে জবাব দিলেন – ঘামের বিনিময়ে, শত আঘাতের বিনিময়ে।
টেল এন্ডারদের নিয়ে লড়ে গেছেন। প্রথমে তাইজুল ইসলাম, পরে তাসকিন আহমেদ। বিস্ময়কর সব জুটি গড়েছেন, গড়েছেন ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অংশটাই তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে। দেশের টেস্ট ইতিহাসের চতুর্থ ডাবল সেঞ্চুরিয়ান এখন তাওহীদ হৃদয়। ষষ্ঠবারের মত কোনো বাংলাদেশি ব্যাটার টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরির মাইলফলক ছুঁয়ে ফেললেন।
৩০৪ ডেলিভারি খেলে পৌঁছে যান স্বপ্নের সেই স্কোরে। সাতটি ছক্কা আর ১৯ টি বাউন্ডারিতে সাজানো ঝকঝকে এক ইনিংস, যা তাওহীদ হৃদয়কে নিয়ে গেল বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসের পাতায়। বিরুদ্ধ পরিবেশে যখন ২০০-এর নিচে অলআউট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা চোখ রাঙানি দিচ্ছিল, হৃদয়ের ব্যাট তখন কাউন্টার অ্যাটাক করল, টেল এন্ডারদের আগলে রেখে তিনি একাই করলেন যুদ্ধ ঘোষণা, যুদ্ধ জয় হল ডাবল সেঞ্চুরি করার মধ্য দিয়ে।

টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিটাকেই নিয়ে গেলেন ডাবল সেঞ্চুরেতে। সিলেটের বাইশ গজে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন তাওহীদ হৃদয়। স্রষ্টার প্রতি জানালেন কৃতজ্ঞতা। কী অসাধারণ এক ইনিংস! ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে একাই টেনে তুললেন বাংলাদেশের ভঙ্গুর ব্যাটিং অর্ডারকে। একই সঙ্গে দিয়ে রাখলেন বার্তা, টেস্ট ক্রিকেটের মেজাজ তাঁর রক্তেই মিশে আছে।
অথচ দ্বিতীয় টেস্টে দু’টি বাজে শটের পরই প্রশ্ন উঠেছিল তাঁর টেস্ট সামর্থ্য নিয়ে। নামের পাশে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল ‘টেস্ট ম্যাটেরিয়াল নন’ তকমা। তাঁকে দিয়ে নাকি লাল বলের ক্রিকেট হবে না! সিলেটে পা রেখেই হৃদয় বুঝিয়ে দিলেন, প্রত্যাবর্তনেরও পথ থাকে। সেই পথে হাঁটতে পারলে সব সমালোচনার জবাব দেওয়া যায় ব্যাট হাতেই।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৫৬ রানের জবাবে বাংলাদেশের সামনে তখন চাপের পাহাড়। ২২ রানে দুই উইকেট হারিয়ে দিশেহারা স্বাগতিকরা। হৃদয় যখন ক্রিজে এলেন, দলের অবস্থা নড়বড়ে। ৫১ রানের মাথায় ফিরলেন নাজমুল হোসেন শান্তও। যাঁকে ঘিরে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিল বাংলাদেশ, সেই ভরসাটুকুও হারিয়ে গেল।

দিনের শেষ সেশনে উইকেট আগলে রাখাই হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কে ধরবেন হাল, কে পার করবেন এই তরী? এমন দুঃসময়ে কান্ডারি হয়ে দাঁড়ালেন হৃদয়। এক প্রান্তে দেয়াল তুললেন। বোলারদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন, ভাঙতে পারলে ভেঙে দেখাও! দৃঢ়তা, সাহস আর প্রতিরোধের প্রতিটি ইট দিয়ে গড়া সেই দেয়াল টপকানোর পথ খুঁজে পাচ্ছিল না ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
তৃতীয় সকালে বিপদ আরও ঘনীভূত হলো। অভিজ্ঞ সতীর্থ মুশফিকুর রহিমকে হারালেন মাঝপথে। এরপর লিটন দাস কিংবা মেহেদী হাসান মিরাজের মতো পরীক্ষিত সৈনিকরাও ফিরে গেলেন সাজঘরে। একের পর এক সঙ্গী হারিয়ে যেন সমর প্রাঙ্গনে একা হয়ে পড়লেন হৃদয়। কিন্তু, ভেঙে পড়লেন না। বরং আরও দৃঢ় হাতে আঁকড়ে ধরলেন ব্যাট। পাল্টা জবাব দিলেন – রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে, চোখ রাঙিয়ে, বুক চিতিয়ে!










