‘প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়, হয় নাকি?’ জীবনানন্দ দাশের এই পঙ্ক্তির মতোই সময়ের নিয়মে একদিন থামতে হয় সবাইকে। ব্যতিক্রম নন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও।
বয়সকে বারবার চ্যালেঞ্জ জানিয়ে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, একের পর এক রেকর্ড নিজের করে নেওয়া মানুষটিকেও শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে হচ্ছে বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চে অবশেষে পর্দা নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পর্তুগিজ মহাতারকা।
মাদেইরার ছোট্ট এক দ্বীপ থেকে যে ছেলেটি একদিন বিশ্বজয়ের স্বপ্ন নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন, দীর্ঘ ২৩ বছরের পথচলা শেষে সেই স্বপ্নের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। পর্তুগালের ঐ গৌরবের জার্সি গায়ে চাপিয়ে ২৩৪ ম্যাচ, ১৪৬ গোল।

সংখ্যাগুলোর মহত্ব অনেকখানি! আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোল স্কোরারের তালিকায় চোখ রাখলে সবার ওপরে মাদেইরার সেই ছোট্ট ছেলেটির নাম! রোনালদো যেন সর্বেসর্বা! একটি প্রজন্মের বেড়ে ওঠা, ফুটবলকে নতুন করে ভালোবাসতে শেখা আর অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী।
২০০৪ সালের ইউরো ফাইনালে গ্রিসের কাছে হারের পর অশ্রুসিক্ত চোখে মাঠ ছেড়েছিলেন এক তরুণ রোনালদো। সেই কান্নার জবাব দিয়েছেন ১২ বছর পর, ২০১৬ সালে। ফ্রান্সের মাটিতে পর্তুগালের প্রথম ইউরো শিরোপা জয়।
এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা নেশন্স লিগ জয়। একের পর এক অর্জনে শুধু নিজের ক্যারিয়ারকেই সমৃদ্ধ করেননি, বদলে দিয়েছেন পর্তুগিজ ফুটবলের ইতিহাসও!

তবে সময়ের নিয়ম বড় নির্মম। যে গতিতে একসময় প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে তছনছ করে দিতেন, বয়সের সঙ্গে সেই গতি কিছুটা কমেছে। যে শরীর একসময় অসম্ভবকে সম্ভব করেছে, তাকেও এখন সময়ের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছিল।
চলতি বছরের বিশ্বকাপেও নামের ভার অনুযায়ী নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি। ন্যাশন্স লিগেও কাটাতে হয়েছে ডাগ আউটে বসেই। হয়তো এই উপলব্ধি থেকেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চে বিদায়ের সিদ্ধান্ত।
কিন্তু রোনালদোকে কি কেবল বর্তমান দিয়ে বিচার করা যায়? তাঁকে কি শুধুই গোল, ট্রফি কিংবা রেকর্ডের সংখ্যায় আটকে রাখা সম্ভব? নিশ্চয়ই নয়। রোনালদো মানে হার না মানার গল্প, প্রতিকূলতাকে জয় করার গল্প, নিজেকে প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যাওয়ার গল্প।

প্রতিভার সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য মানসিকতার মিশেলে কীভাবে নিজেকে কিংবদন্তিতে পরিণত করতে হয়, তার জীবন্ত উদাহরণ তিনি!
শেষ পর্যন্ত সময়ের কাছে হার মানতেই হলো তাঁকে। কিন্তু কিছু মানুষ সময়ের কাছে হারলেও, বয়সের কাছে হারলেও ইতিহাসের কাছে কখনো হারেন না। প্রবাদ আছে, কীর্তিমানের মৃত্যু নাই। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও ঠিক তেমনই একজন।
পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সিতে তাঁকে আর কখনো দেখা যাবে না, কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম মুছে ফেলার সাধ্য কার?

অবসর জীবন সুন্দর হোক, ক্রিশ্চিয়ানো। আপনি তো নিজেই এক মহাকাব্য! এক জীবন্ত উপাখ্যান!











