কয়লাখনির শ্রমিক থেকে গতিদানব

হ্যারল্ড লারউড একজন ইংলিশ ক্রিকেটার যিনি বিখ্যাত ছিলেন তাঁর নিখুঁত বোলিংয়ের জন্য। তিনি ছিলেন একজন জীবন সংগ্রামীও। ভাগ্য বিড়ম্বিত লারউডকে ছোটবেলা থেকেই কাজে লেগে পড়তে হয়। নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসারের আর্থিক টানাপোড়েনে মাত্র ১৪ বছর বয়সে কয়লাখনিতে কাজ করা শুরু করেন লারউড। এ সময়টাতে ক্রিকেটার হিসেবে তাঁর সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হতে শুরু করে।

পেসার মানেই কী বল হাতে বাইশ গজে শুধু গতির ঝড় তোলা? স্বাভাবিকভাবেই পেসাররা গতিশীল হয়ে থাকেন। কিন্তু পেসারদের মূল বিষয়টা কী শুধুই গতিসম্বন্ধীয়?

বর্তমান সময়ের ক্রিকেটে লক্ষ্য করলে দেখা যায় পেসারদের মোকাবেলা করতে খুব একটা সমস্যায় পড়তে হয় না ব্যাটসম্যানদের। বিশেষ করে যেসব পেসাররা শুধুই গতির ওপর নির্ভরশীল। ব্লক হোল বা ভালো জায়গায় বল করে অভ্যস্ত নন যেসকল পেসাররা তাঁরা যতই বেশি গতিতে বল করেন না কেন তাদের খুব সহজেই খেলে ফেলেন এখনকার ব্যাটসম্যানরা।

টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট আসার পর ক্রিকেটটা অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাটসম্যানদের খেলা হয়ে গেছে। পরিসংখ্যানও এমনটাই নির্দেশ করে। এখন অনেকসময় দেখা যায় বোলাররা ভালো জায়গায় বল করেও মার খেয়ে যাচ্ছেন ব্যাটসম্যানদের উদ্ভাবনী কিছু শটে। সেক্ষেত্রে শুধু গতির ওপর নির্ভর করে এখনকার দিনে পেসারদের ভালো করাটা যে কত কঠিন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

একজন পেসার যতই গতিশীল হন না কেন, ভালো জায়গায় বল করতে না পারলে তেমন কোন সফলতা আসে না। ঠিক তেমনই একজন ইংলিশ পেসার ছিলেন যিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন লাইন লেন্থ ঠিক রাখাটাই হলো পেসারদের আসল কাজ। তিনি হ্যারল্ড লারউড। লারউডের শুধু একটাই কথা ছিল, ‘পেসারদের ক্ষেত্রে লাইন-লেন্থটাই আসল। গতির বিষয়টা পরে।’

হ্যারল্ড লারউড একজন ইংলিশ ক্রিকেটার যিনি বিখ্যাত ছিলেন তাঁর নিখুঁত বোলিংয়ের জন্য। তিনি ছিলেন একজন জীবন সংগ্রামীও। ভাগ্য বিড়ম্বিত লারউডকে ছোটবেলা থেকেই কাজে লেগে পড়তে হয়। নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসারের আর্থিক টানাপোড়েনে মাত্র ১৪ বছর বয়সে কয়লাখনিতে কাজ করা শুরু করেন লারউড। এ সময়টাতে ক্রিকেটার হিসেবে তাঁর সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হতে শুরু করে।

আর এই ১৪ বছর বয়সেই লারউড তাঁর প্রতিভার জানান দিয়ে নানকারগেটের দ্বিতীয় সারির দলে খেলা শুরু করেন। সেখানে তাঁর চেয়ে অভিজ্ঞদের বিপক্ষে খেলে প্রথম মৌসুমে ৪.৯ গড়ে লারউড তুলে নেন ৭৬টি উইকেট। এর দু’বছর পর তিনি নানকারগেটের প্রথম সারির দলে খেলার সুযোগ পান যেখানে খেলতেন তাঁর বাবা রবার্ট লারউড। ক্রিকেটের বুট কেনার সামর্থ্য না থাকায় বাবা ও ছেলে দুজনই রাবারের তলাযুক্ত জুতা পরে একসাথে ক্রিকেট খেলতেন।

হ্যারল্ড লারউড একজন ডানহাতি ফাস্ট বোলার ছিলেন যিনি অসামান্য গতির সাথে সঠিক জায়গায় নিখুঁতভাবে অনবরত বল করে যেতেন। উনিশ শতকে খেলার সময় লারউডকে তখনকার সেরা ফাস্ট বোলার হিসেবেও গণ্য করতেন অনেকে। লারউডের বয়স যখন ১৮ তখন তাঁরই প্রতিবেশি সাবেক নটিংহ্যামশায়ার ও ইংলিশ ক্রিকেটার জো হার্ডস্টাফ লারউডের বোলিংয়ে মুগ্ধ হন।

কয়লাখনিতে দীর্ঘসময় কাজ করার ফলে লারউড তখন প্রচুর পরিশ্রম করার ক্ষমতা লাভ করে এবং তাঁর দেহের উপরিভাগের পেশিগুলোও বেশ সুদৃঢ় হয়। সার্বিক দিক বিবেচনায় জো হার্ডস্টাফ রবার্ট লারউডকে পরামর্শ দেন হ্যারল্ডকে ট্রেন্ট ব্রিজ ক্রিকেট গ্রাউন্ডের (নটিংহ্যামশায়ারের হোম ভেন্যু) ট্রায়ালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সেই কথামত রবার্ট তাঁর ছেলেকে নিয়ে যান ট্রায়ালে।

লারউড প্রথমদিকে নেটে তাঁর সহজাত বোলিংটা করতে না পারলেও সময় গড়ানোর সাথে সাথে আত্মবিশ্বাসের সাথে ভালো বোলিং করে ঠিকই নিজেকে মেলে ধরেছিলেন সেদিন। লারউডের বোলিং দেখে তুষ্ট হয়ে ওইদিনই নটিংহ্যামশায়ারের ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাকে ক্লাবের হয়ে খেলার জন্য চুক্তিবদ্ধ করেন।

সেখানে তাঁকে ভালভাবে দেখভাল করা শুরু হয়। শারীরিক গঠনের উন্নতির পাশাপাশি বল গ্রিপ করার বৈচিত্র্য, বাতাসের গতি কাজে লাগিয়ে বল সুইং করানো এবং লাইন লেন্থ ঠিক রেখে বোলিংয়ের বিভিন্ন আর্ট শেখানো হয় লারউডকে। সে বছরই কাউন্টির দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেটে ল্যাঙ্কাশায়ারের দ্বিতীয় সারির দলের বিপক্ষে মাঠে নামানো হয় লারউডকে যেখানে মাত্র ৪৪ রানে তিনি সংগ্রহ করেন আট উইকেট।

তারপর ১৯২৪ সালে নর্দাম্পটনশায়ারের বিপক্ষে খেলার মাধ্যমে কাউন্টি ক্রিকেটে অভিষেক হয় তাঁর। অভিষেকের পর দ্বিতীয় ম্যাচ খেলতে তাকে অপেক্ষা করতে হয় ১০ মাস। কিন্তু তারপর থেকে কাউন্টি ক্রিকেটে নিয়মিত খেলার সুযোগ পান লারউড এবং নিয়মিত পারফর্মার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৮.০১ গড়ে ৭৩ উইকেট নিয়ে ওই মৌসুম শেষ করেন তিনি যেখানে বোলিং সেরা ছিলো ৪১ রানে ১১ উইকেট।

কাউন্টিতে অভিষেক মৌসুমে ভাল পারফরম্যান্স করে নির্বাচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন লারউড। এর পেছনে অবশ্য কৃতিত্ব রয়েছে ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান জ্যাক হবসের। কাউন্টিতে সারের হয়ে খেলার সময় একটি ম্যাচে হবস দুবারই আউট হন লারউডের বলে। তখন লারউডের বোলিং দেখে তাঁকে জাতীয় দলে খেলার জন্য প্রস্তুত বলে মনে হয় হবসের।

জ্যাক হবসের সুপারিশে অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগে আগেই তাই লর্ডসে একটি ট্রায়াল ম্যাচে লারউডকে খেলানো হয় যেখানে তিনি পেয়েছিলেন ৪টি উইকেট। সেই সুবাদে ১৯২৬ সালে ঘরের মাঠে অ্যাশেজ সিরিজে তাকে দলে রাখা হয় যদিও প্রথম ম্যাচের একাদশে স্থান হয়নি তাঁর। পাঁচ টেস্টের ওই সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে লারউডের অভিষেক হয়। অভিষেক ম্যাচে লারউড তুলে নেন তিনটি উইকেট। এই পারফরম্যান্সে অবশ্য ৩য় ও চতুর্থ ম্যাচে দলে জায়গা হয়নি তাঁর।

তারপর পঞ্চম ম্যাচে আবারো হবসের সুপারিশক্রমে একাদশে সুযোগ পান লারউড এবং ওই ম্যাচে তুলে নেন ৬টি উইকেট। ওই সিরিজে ২ ম্যাচ খেলে লারউড সংগ্রহ করেন ৯টি উইকেট। এখন পর্যন্ত টেস্টে ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ের ম্যাচেও বল হাতে উজ্জ্বল ছিলেন হ্যারল্ড লারউড। ১৯২৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই ম্যাচে এক ইনিংসে মাত্র ৩২ রানে ছয় উইকেট তুলে নেয়ার পাশাপাশি মোট ৮ উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডকে ৬৭৫ রানের সুবিশাল একটি জয় পাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখেন তিনি। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের বসন্তকাল চলে ১৯৩২ সালের বডিলাইন সিরিজে।

২১ টেস্টের ক্যারিয়ারে তাঁর সংগ্রহ করা ৭৮ উইকেটের মধ্যে ৩৩ টিই আসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওই সিরিজে। ফলাফলস্বরূপ ইংল্যান্ড ৪-১ ব্যবধানে সিরিজ জয় লাভ করে। নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফলতম সিরিজে সবচেয়ে বিতর্কিতও হতে হয় লারউডকে। সিরিজে ডন ব্র্যাডম্যানকে থামাতে ইংলিশ অধিনায়ক ডগলাস জার্ডিন লেগ সাইডে ছাতার মত ফিল্ডিং সাজিয়ে পাঁজর বরাবর ক্রমাগত বল করার নির্দেশনা দেন লারউডকে।

লারউডও অধিনায়কের কথামত কাজ করেন যা অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে অখেলোয়াড়ীসুলভ আচরণ হিসেবে গণ্য হয়েছিল। এর জন্য অবশ্য সিরিজ শেষে কম বিতর্কের সম্মুখীন হতে হয়নি লারউডকে। এর প্রভাব পড়ে দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কেও। একটা সময় লারউডকে অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশও দেয়া হয় যা অগ্রাহ্য করেন লারউড। লারউডের মতে তিনি তাঁর অধিনায়কের কথামত কাজ করেছেন। এতে তাঁর ক্ষমা চাওয়ার কিছুই নেই।

অথচ যিনি এর মূল হোতা সেই জার্ডিনকে ক্ষমা চাওয়ার জন্য কোন নির্দেশনা দেয়া হয়নি। ওই সিরিজ শেষের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকেও ইতি ঘটে হ্যারল্ড লারউড নামক অধ্যায়ের। যদিও নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেটে কিছুদিন খেলা চালিয়ে গিয়েছিলেন লারউড। আর ৩৬১ ম্যাচের ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ার শেষে তাঁর প্রাপ্তির খাতায় যোগ হয় ৭২৯০ রান ও ১৪২৭ টি উইকেট।

১৯৫০ সালে সপরিবারে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হন হ্যারল্ড লারউড। সেখানে তিনি একটি কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেন। অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হলেও মাতৃভূমির টানে মাঝে মাঝে ইংল্যান্ডে এসে ঘুরে যেতেন লারউড। নটিংহ্যামশায়ার ও ইংল্যান্ড ক্রিকেটে  অবদানের জন্য তাঁর নামে ট্রেন্ট ব্রিজে একটি স্ট্যান্ড নামাঙ্কিত করা আছে। বর্তমানে হ্যারল্ড লারউড আছেন না ফেরার দেশে।

১৯৯৫ সালের ২২ জুলাই, ৯০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। তবে মরে গিয়েও তিনি বেঁচে আছেন এই পৃথিবীতে, বেঁচে আছেন অগণিত মানুষের স্মৃতির মণিকোঠায়। কারণ লাইন লেন্থের ওপর ভর করে সফলতা পাওয়ার দৃষ্টান্ত যে তিনিই প্রতিষ্ঠা করে গেছেন ক্রিকেট বিশ্বে। আধুনিক যুগের মার মার কাট কাটের ক্রিকেটে তাই বোলারদের জন্য তাঁর চেয়ে ভালো আদর্শ আর কে হতে পারেন!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...