দুর্দিনের নায়ক, সুদিনের নয় কেন!

জাদেজা সাকিব, স্টোকসদের মতো হতে পারতেন কি না তা একবারে বলে দেয়া যায় না। তবে জাদেজার অন্তত এখনকার চেয়ে ভালো অলরাউন্ডার হওয়ার সামর্থ্য ছিলো। তবে ভারত কখনোই জাদেজাকে ‘আনফোল্ড’ করে নি।ক্যারিয়ার যখন শুরু করে তখন জাদেজার জন্য ৫/৬/৭ পজিশন ছিল না। কিন্তু যখন যুবরাজ সিং চলে যাওয়ার জাদেজার উপরে আসা উচিত ছিল। তা না তারা স্টুয়ার্ট বিনিকে খেলায় এরপর কেদার যাদব, বিজয় শংকর। কখনোই জাদেজাকে আনে নি। টেস্টেও ওইভাবে সাহা, অশ্বিনের পর আনা হয়। 

রবীন্দ্র জাদেজার ক্যারিয়ার তিনি তাঁর শক্তির জায়গাটা কখনো মঞ্চায়িত করতে পারেননি। দশ বছরের ক্যারিয়ারে কখনো ওভাররেটেড ট্যাগ পেয়েছেন, কখনো আবার হয়েছেন দলের ‘দ্বিতীয় পছন্দ’।

জাদেজা ক্যারিয়ারের শুরুর অংশে খুবই হাইলি রেটেড ক্রিকেটার ছিলেন। অনেকের প্রশ্ন ছিল এতটা যোগ্য সে ছিলো কিনা? জাদেজাকে আমরা চিনছি শুধু একজন বোলার হিসাবে। আর তাঁকে জানছি ভারতীয় মিডিয়ার তৈরী সাকিব আল হাসানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে।

জাদেজা অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয়ী দলের অন্যতম এক সদস্য। যেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিরাট কোহলি। ডমেস্টিকে জাদেজার হাতে খড়িটা শেন ওয়ার্নের অধীনে। রাজাস্থানে খেলার সময় ওয়ার্ন তাকে ‘রকস্টার’ উপাধি। এই লেগ স্পিন কিংবদন্তি তাঁকে ভারতের সেরা তরুণ প্রতিভা বলে রায় দেন।

রবীন্দ্র জাদেজার ব্যাটিংটা হল না দেখা একটা অংশ। টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেকের আগেই জাদেজা তিনটি ট্রিপল সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বসেন।  প্রথম শ্রেনির ম্যাচে এই রেকর্ড আছে মাত্র কিছু ক্রিকেটারেরই। ডন ব্রাডম্যান,  ওয়ালি হ্যামন্ড, ব্রায়ান লারা, ডব্লিউ জি গ্রেস, গ্রাহাম হিক আর মাইক হাসিরই। ক্রিকেটে অভিষেকের আগেই বসে পড়েন এই কিংবদন্তিদের সাথে। জাদেজা মাত্র ২৩ বছর বয়সেই এই ট্রিপল ট্রিপল সেঞ্চুরি করেন। দেড় বছর সময়ের মধ্যে সে এই তিনটা ট্রিপল সেঞ্চুরি করেন।

আগে তার অভিষেক হয় ওয়ানডেতে। অভিষেক ম্যাচে মুরালিদের সাথে ৬০ রান করে বসেন। পরের সফরে ইংল্যান্ডের লর্ডসে ৫৮-৫ থেকে ভারতকে জয়ের কাছাকাছি নিয়ে যান। ২০১১ বিশ্বকাপের আগে বড় রকমের ইনজুরিতে পড়লে তার স্লটে ইউসুফ পাঠান বিশ্বকাপে যান।

ইনজুরি থেকে ফিরে রঞ্জিতে এক মৌসুমে ৭৩৯ রান আর ৪৪ উইকেটও নেন। ওই সময় ভারতীয় দলে অলরাউন্ডার হিসেবে তাকে ৫/৬-এ নেওয়ার সুযোগ ছিল নাহ। প্রজ্ঞান ওঝাঁর অ্যাকশন বিতর্ক আর সাথে ইনজুরিতে সুযোগ মেলে। ব্যাটিং পজিশন থাকে ৮/৯-এ। মাইকেল ক্লার্ককে ৬ ইনিংসে ৫ বারই আউট করেন জাদেজা।  এত কাণ্ডকারখানা ঘটায় ফেলানো একজনরে নিয়ে বাড়তি আলোচনা হবে না? মিডিয়া তারে আকাশে না তুলে যাইতো কই? রবীন্দ্র জাদেজা ফোর্স করছে তারে আলোচনায় আনতে।

সে কতটা ভালো ব্যাটসম্যান এটা দেখানোর পর্যাপ্ত সুযোগ পায় নি। ৫০ টি-টোয়েন্টি খেলার পর তার রান ২২০ ও না। নামে মাত্র অলরাউন্ডার হিসাবেই ভারতকে এতবছর শুধু বোলার রোল প্লে করে সার্ভিস দিয়েছেন।

ভারত দলে সে দ্বিতীয় স্পিনার। ২০১৭ এর আগে ভারতীয় মিডিয়াতে তার যে চাকচিক্য ছিল বাদ পড়ার সাথেই তা শেষ। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি থেকে বাদ পড়েন একেবারে। টেস্টে  কখনো জাদেজা প্রথম পছন্দ ছিলেন না। সবসময় আগে এসেছেন অশ্বিন। ভারত এক স্পিনার নিয়ে নামলে সবসময় জাদেজাকে বাদ পড়তে হয়। তবে ঘরের মাঠে কিংবা ঘরের বাইরে তাকেই বসানো হয়। পারফরমেন্স জাদেজার যেমন থাক।

আড়ালে চলে যাওয়া জাদেজা ২০১৮ তে হঠাৎ একজনের ইনজুরিতে সুযোগ পান এশিয়া কাপে। এরপর রঙিন পোশাকে সুযোগ পান মাঝে মধ্যে। টেস্টে গতনুগাতিক বিদেশে এক স্পিনার হিসাবে অশ্বিন সুযোগ পান।ঘরের মাঠেও প্রেক্ষাপটেও ভিন্নতা আসে। ভারত পিওর স্পিন ট্রাক বানায় না। ঘরের মাঠে তিন পেসার নিয়ে খেলায় প্রায় সময়ই দলের বাইরে থাকতে হয়।

তবে যখনই সুযোগ পান তখনই নিজের ব্যাটিং ক্লাসটা দেখান। ২০১৮ থেকে এখন পর্যন্ত জাদেজা এশিয়ার বাইরে সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ছয় টেস্ট (চলমান টেস্ট বাদে)। ব্যাটিং পজিশনে নিচে হওয়াতে সুযোগ পান কম, কখনো থাকেনা সঙ্গী।  এই ৬ টেস্টে ৪৫.৫ গড়ে রান করেছেন ২৮৯। এর মধ্যে ৮৬ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন ইংল্যান্ডে ওভালে। গত অস্ট্রেলিয়া সফর সিডনিতে ৮১ রান করেছিলেন। উইন্ডিজের মাটিতে ৫৮ রানও আছে।

যখনই লম্বা সময় ব্যাটিং এ সুযোগ পান তখনই ভালো ইনিংস খেলেন সেটা যে ফরম্যাটেই হোক। ওডিআইতে তার কিছু সমসাময়িক ইনিংসের কথাই ধরেন। বিশ্বকাপে দুইটা মাত্র ইনিংসে ব্যাট করার সুযোগ পান। সবাই যখন ব্যর্থ সেমির মতো প্লাটফর্মে নিউজিল্যান্ডের সাথে ৭৭ রান করে ফেলেন। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে এক ম্যাচে সুযোগ পেয়ে ৫৫ রান করেন। অস্ট্রেলিয়ার সাথে এই সিরিজটাতেও ৬৬ রান করে ওয়াইটওয়াশ থেকে বাচালেন।

জাদেজা কখনোই বাজে ব্যাটসম্যান ছিলেন না। এশিয়ার বাইরে তাঁর ব্যাটিং রেঞ্জ এখন আরও ভালো। কোহলির বদলি হিসাবে জাদেজাকে অনেকেই পছন্দ করেনি। ভুল সিদ্ধান্ত তো ছিল না, ভারত যে সন্মান বাচাঁতে নামছে না, তারা জয়ের কথা ভাবছে এইটুক ইনটেনশন তারা ম্যাচের আগে সেট করে দলের উপর থেকে নেগেটিভ ছায়া সরাতে পারছে।

ভারতের ফিল্ডিং দুর্দান্ত ছিল। সবাই চার্জড আপ ছিলো। এই দল যে বিধ্বস্ত হয়েছে তাঁর কোনো ছাপ ছিলো না। আর জাদেজা জন্য ভালো লাগতেছিলো কারণ সে কোহলির বিকল্প হিসেবে আসায় প্রোপার অলরাউন্ডার হিসাবে ৬/৭ এ ব্যাটিং করতে পারবে। যেটার সুযোগ সে খুব কম পেয়েছে। জাদেজা তার ব্যাটিং ক্লাস দেখিয়েছেন। হাফ সেঞ্চুরিও করেছেন, রাহানের সাথে বড় জুটি গড়েছেন। ভারতকে ভাল একটা অবস্থায় নিয়ে গেছেন।

কোনও তুলনা না শুধু একটা পরিসংখ্যান বর্তমান অলরাউন্ডারদের মধ্যে। ২০১৬ থেকে ২০২০ এই সময়ের মধ্যে ব্যাটিং ও বোলিং গড়ের মধ্যে পার্থক্যে জাদেজার অবস্থান শীর্ষে। জাদেজার পার্থক্য ২১.৭২, এরপরে স্টোকস ১৪.২৫, সাকিব ১২.৭৫ এবং হোল্ডার ৭.৫০।

জাদেজা সাকিব, স্টোকসদের মতো হতে পারতেন কি না তা একবারে বলে দেয়া যায় না। তবে জাদেজার অন্তত এখনকার চেয়ে ভালো অলরাউন্ডার হওয়ার সামর্থ্য ছিলো। তবে ভারত কখনোই জাদেজাকে ‘আনফোল্ড’ করে নি।ক্যারিয়ার যখন শুরু করে তখন জাদেজার জন্য ৫/৬/৭ পজিশন ছিল না। কিন্তু যখন যুবরাজ সিং চলে যাওয়ার জাদেজার উপরে আসা উচিত ছিল। তা না তারা স্টুয়ার্ট বিনিকে খেলায় এরপর কেদার যাদব, বিজয় শংকর। কখনোই জাদেজাকে আনে নি। টেস্টেও ওইভাবে সাহা, অশ্বিনের পর আনা হয়।

সাবেক নাম্বার ওয়ান বোলার, অলরাউন্ডার হওয়ার পরও এখনো দলে জায়গা অবধারিত না হওয়াটা দু:খজনক। তার ব্যাটিং নৈপুণ্য পুরোটা ক্রিকেটের দেখা হয় নি। যতটা ভালো অলরাউন্ডার হতে পারতেন সেই টুকুও দৃশ্যমান নাহ।

জাদেজাকে কেবলই ‘দুর্দিনের বন্ধু’ বানিয়ে রেখেছে, যার কথা সুদিনে মনে পড়ে না।

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...