শুধু তারাই হতাশ হয়েছে, যারা ফুটবল বোঝে না: টমাস ডুলি

আমাদের এমন একটি ফুটবল খেলোয়াড় তৈরির দেশ গড়ে তুলতে হবে, যে দেশ শুধু ফুটবল সমর্থক তৈরির দেশ নয়। আমাদের তথাকথিত পেশাদার দলগুলোর নিজেদের খেলোয়াড় গড়ে তোলার জন্য কোনো যুব উন্নয়ন ব্যবস্থাই নেই! তাহলে বাংলাদেশে উন্নয়নটা কোথায় হচ্ছে? কয়েকটি বেসরকারি একাডেমি দিয়ে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো বড় লিগের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব নয়। ওই লিগগুলোতে জার্মানি, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশের প্রথম বিভাগের ক্লাব থেকে আসা আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়েরা খেলেন।

পরাজয়ের ব্যবচ্ছেদ, ফুটবলের অন্তঃসারশূন্যতা আর উত্তরণের দুরূহ পথ। বাংলাদেশের ফুটবলের নানা অসংগতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন জাতীয় দলের প্রধান কোচ টমাস ডুলি। খেলা ৭১-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তাঁর কণ্ঠে উঠে এসেছে নির্মম বাস্তবতা, তির্যক সমালোচনা ও আগামীর স্বপ্ন।

প্রশ্ন: আগামী মাসে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ দলের কাছ থেকে আপনার প্রত্যাশা ও আপনার লক্ষ্য কী?

টমাস ডুলি: আমাদের লক্ষ্য ফাইনালে ওঠা এবং টুর্নামেন্ট জেতা। এটাই আমাদের উদ্দেশ্য। কাজটা কঠিন, তবে বাস্তবসম্মত। যদি আমরা একসঙ্গে কাজ করি, লড়াই করি এবং দল হিসেবে ফুটবল খেলি, তাহলে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।

প্রশ্ন: দলে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আরও প্রবাসী ফুটবলার যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি? নাকি আসিয়ান কাপের স্কোয়াডই ধরে রাখবেন?

টমাস ডুলি: মোহাম্মদ মাহী খান আমাদের তালিকায় আছে, রোনান সুলিভানও তালিকায় আছে। দেখা যাক, বিষয়টি কীভাবে এগোয়।

প্রশ্ন: জায়ান হাকিম ও ট্রেভর ইসলামের সর্বশেষ অবস্থা কী?

টমাস ডুলি: ট্রেভর আসতে চায় না। আর হাকিমের ব্যাপারে আমি জানি না। সর্বশেষ যা শুনেছি, তাতে সে আসতে পারবে না। কেন পারবে না, সেটা জানতে হলে বাফুফে সহ-সভাপতি ফাহাদ করিমকে জিজ্ঞেস করতে হবে। ট্রেভর আগামী বছর আসতে চায়।

প্রশ্ন: আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা হতাশাজনক ছিল। এই টুর্নামেন্ট থেকে দল কীভাবে উন্নতি করতে পারে? আর এই আসর থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক প্রাপ্তি কী বলে মনে করেন?

টমাস ডুলি: কী হতাশাজনক ছিল? শুধু তারাই হতাশ হয়েছে, যারা ফুটবলের খুঁটিনাটি বোঝে না।

প্রশ্ন: শেষ ম্যাচে ৯-২ গোলের পরাজয় কি সত্যিই হতাশাজনক ছিল না?

টমাস ডুলি: না, ছিল না! যখন এমন একটি দলের খেলোয়াড়েরা ফুটবল খেলে কোনো বেতন পায় না, আর তাদের প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা লাখ লাখ ডলার আয় করে, তখন কি আপনি মনে করেন না যে ফিটনেস, টেকনিক, খেলার গতি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ফুটবলীয় জ্ঞানে পার্থক্য থাকবে? ফুটবলে এসবের কি কোনো ভূমিকা নেই?

বাংলাদেশের এমন একজন খেলোয়াড়, যে গত দুই-তিন মাস কোনো ক্লাবে অনুশীলন করেনি এবং হয়তো বছরের কিছু ম্যাচই খেলেছে, তার সঙ্গে এমন খেলোয়াড়দের তুলনা করুন, যারা ছয় সপ্তাহের প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রথম সপ্তাহে দিনে তিনবার এবং পরের দুই সপ্তাহে দিনে দুবার অনুশীলন করেছে। এরপর জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে দুটি করে ম্যাচ খেলেছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের লিগের খেলোয়াড়দের ওপর কোনো চাপই নেই। মিডিয়া কিংবা সমর্থকেরা তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে না। এমন পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের মধ্যে পার্থক্য থাকবে না?

প্রশ্ন: আপনার মতে, এই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠার সবচেয়ে ভালো উপায় কী?

টমাস ডুলি: আমাদের এমন একটি ফুটবল খেলোয়াড় তৈরির দেশ গড়ে তুলতে হবে, যে দেশ শুধু ফুটবল সমর্থক তৈরির দেশ নয়। আমাদের তথাকথিত পেশাদার দলগুলোর নিজেদের খেলোয়াড় গড়ে তোলার জন্য কোনো যুব উন্নয়ন ব্যবস্থাই নেই! তাহলে বাংলাদেশে উন্নয়নটা কোথায় হচ্ছে?

কয়েকটি বেসরকারি একাডেমি দিয়ে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো বড় লিগের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব নয়। ওই লিগগুলোতে জার্মানি, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশের প্রথম বিভাগের ক্লাব থেকে আসা আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়েরা খেলেন।

আপনি কি এখনো মনে করেন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের হার হতাশাজনক ছিল? আপনি জানেন, ভারতের মিডিয়া কী বলেছিল?

তারা বলেছিল, শেষ তিনটি ম্যাচ ভারতের ফুটবলের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। এই ম্যাচগুলো তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে, আরও উন্নতির জন্য কী করতে হবে এবং অন্যদের সঙ্গে তাদের পার্থক্য কোথায়।

প্রশ্ন: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ এত বড় ব্যবধানে হারেনি। হঠাৎ পারফরম্যান্সে এমন পতনের কারণ কী? ক্লাবগুলোর নিষ্ক্রিয়তা এবং খেলোয়াড়দের যথাযথ প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতির অভাবই কি এর কারণ? এ বিষয়ে বাফুফে আপনাকে কী জানিয়েছে এবং আপনি তাদের কী পরামর্শ দিয়েছেন?

টমাস ডুলি: আমি এখানে যা লিখছি, আপনি কি তা বুঝতে পারছেন?ইন্দোনেশিয়া কবে থেকে ইউরোপে খেলা আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলারদের জাতীয় দলে নিয়েছে? মালয়েশিয়া কবে থেকে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের নাগরিকত্ব দিয়ে দলে নিচ্ছে?

ইন্দোনেশিয়ার যদি ঘরের মাঠে ফাইনালে উঠতে ১০টি গোল করার প্রয়োজন হতো, তাহলে সিঙ্গাপুর কি মাত্র ২-০ গোলে হারত বলে আপনি মনে করেন? পারফরম্যান্সে এই আকস্মিক পতনের কারণ আমি আগেই ব্যাখ্যা করেছি। আমাদের খেলোয়াড়েরা মাসের পর মাস অনুশীলন করেনি। তাদের যথাযথ উন্নয়ন হয়নি। এরপর এমন একটি টুর্নামেন্টে তাদের এই ধরনের খেলোয়াড়দের বিপক্ষে খেলতে হয়েছে, যেখানে প্রতিপক্ষের ফাইনালে উঠতে অনেক গোল করার প্রয়োজন ছিল।

প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা বছরের পর বছর ধরে সর্বোচ্চ পেশাদার পর্যায়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। গত দুই বছরে তারা যতটা প্রশিক্ষণ নিয়েছে, আমাদের দেশীয় খেলোয়াড়েরা গত ১০ বছরেও ততটা নেয়নি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের ফুটবল এখন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের দিকে ঝুঁকছে। এবার কি নাগরিকত্ব দিয়ে বিদেশি খেলোয়াড়দের দিকেও নজর দেওয়ার সময় এসেছে?

টমাস ডুলি: সবচেয়ে সহজ পথ হলো সুলিভান ব্রাদার্সের মতো এবং ওয়াটসনের মতো আন্তর্জাতিক মানের বাংলাদেশি খেলোয়াড় খুঁজে বের করা। তারাই আমাদের সঠিক পথে এগিয়ে নিতে পারে। আমাকে বিশ্বাস করুন! আমি এই পেশায় ৪৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে আছি এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের লিগে কাজ করেছি।

হ্যাঁ, বিষয়টি দুঃখজনক, কিন্তু এটাই সত্য। আমরা যদি বাস্তবতা নিয়ে কথা না বলি, তাহলে কখনোই উন্নতি করতে পারব না। যেসব সমর্থক কখনো ফুটবল খেলেননি, তাঁরা পেশাদার ও অপেশাদার খেলোয়াড়দের মধ্যে পার্থক্য বোঝেন না। আমাদের খেলোয়াড়েরা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জাপান কিংবা ইউরোপে খেলেন না কেন?

আমি জার্মানির সাবেক জাতীয় দলের কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের সঙ্গে ফিলিপাইনের সাবেক জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বিপক্ষে খেলেছিলাম। আমাদের বয়স ছিল ৫৫-৬৫ বছর, আর ফিলিপাইনের খেলোয়াড়দের বয়স ছিল ৩৫-৪৫ বছর। জানেন, ম্যাচের ফল কী হয়েছিল? আমরা ১৩-০ গোলে জিতেছিলাম! কেন? ফুটবলীয় জ্ঞানের কারণে!

কখন বল খেলতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কীভাবে খেলতে হবে, কোথায় বল দিতে হবে, কখন সামনে এগোতে হবে, কখন অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে, এসব বোঝার কারণেই এই পার্থক্য তৈরি হয়।

প্রশ্ন: আপনার বর্তমান অবস্থান থেকে আপনি আসলে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবেন বাংলাদেশের বর্তমান দলে?

টমাস ডুলি: আমরা কেবল কয়েকটি বিষয়ে পরিবর্তন আনতে পারি। রক্ষণভাগকে আরও সুসংগঠিত করা। পাসের নির্ভুলতা বাড়ানো। খেলোয়াড়দের মনে করিয়ে দেওয়া, বল পাওয়ার আগেই যেন তারা চারপাশের মাঠ পর্যবেক্ষণ করে নেয়। তাহলে বল পাওয়ার পর কী করতে হবে, তা তারা আগে থেকেই বুঝতে পারবে। কঠোর পরিশ্রম করা। অর্থাৎ, যখনই সুযোগ আসবে, লড়াই করতে হবে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখা যাবে না, হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না এবং যখনই সম্ভব সতীর্থকে সাহায্য করতে হবে।

মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে কয়েকজন খেলোয়াড়ের লড়াই করার মানসিকতা দেখে আমি হতাশ হয়েছিলাম। দেশের হয়ে লড়াই করাই একজন খেলোয়াড়ের প্রথম দায়িত্ব। আপনার খারাপ দিন যেতেই পারে, কিন্তু অন্তত দৌড়াতে হবে, লড়াই করতে হবে!

প্রশ্ন: বাংলাদেশের পক্ষে কি কখনো এএফসি এশিয়ান কাপ ও ফিফা বিশ্বকাপে খেলা আদৌ সম্ভব? বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচ হিসেবে প্রথমবার আসার পর আপনি দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ আশাবাদী বক্তব্য দিয়েছিলেন।

টমাস ডুলি: হ্যাঁ, অবশ্যই সম্ভব! তবে এর জন্য উন্নয়ন প্রয়োজন। ফিলিপাইনে আমাদের চার বছর সময় লেগেছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই রকম সময় লাগবে। খেলোয়াড়দের এই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে, আমাদের ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং আমরা যা বলছি, তা অনুসরণ করতে হবে।

ভিয়েতনামে কাজ হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে কাজ হয়েছে, ফিলিপাইনেও কাজ হয়েছে। বাংলাদেশেও হবে। কিন্তু এমন কোনো ওষুধ নেই, যা খেয়ে হঠাৎ টেকনিক শিখে যাবেন, ফুটবলীয় জ্ঞান অর্জন করবেন কিংবা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। সময় লাগে। আমি কোনো জাদুকর নই।

যেসব খেলোয়াড় আমার পরামর্শ অনুসরণ করেছে, তারা সফল হয়েছে। যেসব দল আমার পরামর্শ মেনেছে, তারা সফল হয়েছে। বাংলাদেশও সফল হবে।

তবে আপনাকে সৎ হতে হবে এবং সত্য বলতে হবে, তা যত কঠিনই হোক না কেন। বাস্তবতা যেমন, সেটি সেভাবেই তুলে ধরতে হবে। তাহলেই যেসব পরিবর্তন প্রয়োজন, সেগুলো আনা সম্ভব হবে। আপনার শরীরে ব্যথা হলে আপনি কি ডাক্তারের কাছে যান, নাকি প্লাম্বারের কাছে?

যে ব্যক্তি এত বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কাজ করেছেন এবং অনেক সাফল্য পেয়েছেন, তাঁর অভিজ্ঞতায় নিশ্চয়ই কিছু না কিছু আছে। আর যিনি কখনো ফুটবল খেলেননি, সেই সমর্থকই কি বলে দেবেন কোনটি সঠিক, কোনটি ভুল?

ঠিক আছে, স্যার। আমার এখন একটু ঘুমানো প্রয়োজন।

প্রশ্ন: ঠিক আছে, বিদায়। শুভরাত্রি।

টমাস ডুলি: শুভরাত্রি। আর আমি যা বলেছি, তা নিয়ে ভাবুন। কথাগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন, সেগুলোকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করুন।

লেখক পরিচিতি

আল ওয়াসি তালুকদার

প্রথম প্রেম, শেষ প্রেম, মাঝখানে যত প্রেম, সবই বোধহয় ক্রিকেটকে ঘিরে! দেশের ঘুণেধরা ফুটবলের প্রতিও মায়াটা নেহাত কম নয়। সাংবাদিকতার অ-আ-ক-খ শিখতে এখনও বহু পথ বাকি, তাই সাংবাদিক পরিচয়ে সংকোচের অন্ত নেই। টুকটাক শব্দের চাষ করি, সেই ফসলই ঠাঁই পায় আমার নতুন ঠিকানা, খেলা ৭১-এ। স্বপ্নের অন্বেষণে রত এক নগণ্য কলমশ্রমিক আমি।

জন্ম বরিশাল সদরে, পৈতৃক শিকড় উজিরপুরে। বেড়ে ওঠা, মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিকের পাঠ চুকেছে পিরোজপুরের নেছারাবাদে। বর্তমানে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে সাংবাদিকতা বিভাগে স্নাতক (সম্মান) অধ্যয়নরত।

Share via
Copy link