খেলা তৈরির কিংবদন্তি

ফুটবলের স্বর্ণভূমি হলো ল্যাটিন আমেরিকা; বিশেষ করে ব্রাজিল। এখানে যুগের পর যুগে অনেক কিংবদন্তি এসেছেন। পুরো মাঠের প্রত্যেকটা পজিশনে একের পর এক ফুটবলার এসেছেন যারা যুগে যুগে ফুটবল মাঠে শাসন করে গেছেন। এই কিংবদন্তিদের মধ্যে একজন হলেন কাফু। ব্রাজিলের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার।

ফুটবল হলো গোল করা ও আটকানোর খেলা।

এখানে গোল করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ তাঁর থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো গোল আটকানো। কিন্তু এই গোল আটকানোর এই গুরুত্বপূর্ন কাজে কেউ বেশি আগ্রহ দেখায় না। বিশেষ করে তরুণ অর্থাৎ যারা ফুটবলে ক্যারিয়ার গড়তে চায় তাঁরা সবাই চায় আক্রমণভাগের ফুটবলার হতে। তাঁরা চায় তাঁদের কাজ হবে গোল করা।

ফুটবলে সবচেয়ে বেশি আলো পান আক্রমণ ভাগের ফুটবলাররা। এর জন্যই হয়তো রক্ষণে বড় তারকা খুজে পাওয়া যায় না। এই রক্ষনের বিরল তারকাদের একজন হলেন মার্কোস এভাঞ্জেলিয়েস্তা ডি মোরাইস।

চিনতে পারলেন না? না, এতো জটিল নামে তাকে চেনা যাবে না। তিনি আমাদের কাফু। ব্রাজিলের কাফু।

ফুটবলের স্বর্ণভূমি হলো ল্যাটিন আমেরিকা; বিশেষ করে ব্রাজিল। এখানে যুগের পর যুগে অনেক কিংবদন্তি এসেছেন। পুরো মাঠের প্রত্যেকটা পজিশনে একের পর এক ফুটবলার এসেছেন যারা যুগে যুগে ফুটবল মাঠে শাসন করে গেছেন। এই কিংবদন্তিদের মধ্যে একজন হলেন কাফু। ব্রাজিলের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার।

ব্রাজিলের ডিফেন্স লাইনের যুগের পর যুগ ধরে এসেছেন একের পর এক কিংবদন্তি। ১৯৭০ এর দশকে এসেছেন কার্লোস আলবার্তো, মরিনহো চাগাজ। ৮০ এর দশকে এসেছিলেন লিওন্দ্রো এবং জুনিওর। নব্বইয়ের দশকে এইসব ফুটবলার ব্রাজিলের ডিফেন্স লাইনকে সমৃদ্ধ করেগেছেন।

এছাড়াও ২১ শতকের শুরুতে ব্রাজিলের ডিফেন্স লাইনের ভরসা হিসেবে ছিলেন মাইকন এবং দানি আলভেস। আর এখন ব্রাজিল লাইনের ডিফেন্সে লাইনের ভরসা হিসেবে আছেন মার্সেলো এবং আলেজান্দ্রো সান্দ্রো। কিন্তু ২১ শতকের এই মাঝামাঝি সময়ে ব্রাজিলের রক্ষণভাগ সামলেছেন রবার্তো কার্লোস এবং কাফু।

কাফু ছিলেন ব্রাজিলের হয়ে সবেচেয়ে ম্যাচ খেলা ফুটবলার। ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ী ডিফেন্ডার।

কাফু জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭০ সালে, ব্রাজিলের সাও পাওলোতে। কাফু নিজের ফুটবলার হিসেবে গড়ে উঠার জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা মানেন তার জন্ম সালকেই। কারণ এই বছরেই ব্রাজিল তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ জয় করে। বিশ্বকাপের এই বছরেরই ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার কার্লোস আলবার্টো এক গোল করে ইতালিকে হারাতে সাহাযা করেন। কাফুর আসল নাম মার্কোস এভাঞ্জেলিয়েস্তা ডি মোরাইস।

তিনি কাফু তাঁর ডাক নাম পেয়েছিলেন সাবেক পেশাদার ফুটবলার কাফুরিঙ্গা। তার সাথে জীবনের শুরুর দিকে ডান পাশে খেলতেন কাফু। আর সেখানে খেলার কারণেই তাঁর ডাক নাম হয় কাফু এবং এই নাম দিয়েই বিশ্বজুড়ে খ্যাতি করছেন তিনি।

কাফুর শুরুটা ছিলো বন্ধুর পথ। জার্ডিম ইরেনা, ব্রাজিলের দারিদ্রপীরিত একটি অঞ্চল। এই অঞ্চল কাফুকে শিখিয়েছে কিভাবে পরিশ্রম কর‍তে হয়। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ব্রাজিলের বড় ক্লাব পালমেইরাস এবং সান্তোস থেকে বাদ পড়েন। এর পর তার নিজের এলাকার ক্লাব সাও পাওলো থেকেও বাদ পড়েন কাফু। ১৮ বছর বয়স হয়ে যাওয়ার কারনেই মূলত বাদ দেয় তাঁকে।

এই তিনটি ক্লাব থেকে বাদ পড়ার পর তিনি সুযোগ পান স্থানীয় ক্লাব ইতাকাকুসেতুবাতে। যুব দলের কোচ কার্লোনিহোস নেভেসকে তাঁকে দল নেয়ার জন্য বোর্ডের সাথে বেশ যুদ্ধ করেন। ইতাকাকুতেবাতে কাফু বেশ সফল হন। আর এখানে খেলেন তিনি একজন মিডফিল্ডার হিসেবে। আর এখান থেকেই শুরু কাফুর উন্নতি এবং এগিয়ে চলা।

কাফুর সবচেয়ে ভালো উন্নতি ছিলো কিংবদন্তি কোচ টেলে সান্টানার অধীনে। তিনি ১৯৮২ সালে ব্রাজিল দলের কোচ, যিনি কিনা ব্রাজিলকে আবারো ফিরে এনেছিলেন সাম্বাতে। আর তাঁর কারণেই মিডফিল্ডার থেকে রাইট ব্যাক হিসেবে খেলা শুরু করেন কাফু। এরপর আবার সুযোগ পান সাও পাওলোতে। সাও পাওলোর নিয়মিত রাইট ব্যাক জে টিওডোরোর ইনজুরির কারণে সুযোগ পান সাও পাওলোতে। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ট্রান্সফার ছিলো এটি। এর মাধ্যমেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা রাইট ব্যাক পায় ব্রাজিল।

সান্টানার অনুপ্রেরণাতে এগিয়ে যেতে থাকেন কাফু। কাফু ছিলেন এমন একজন রাইট ব্যাক, যিনি থাকলে ডান দিক থেকে আক্রমণ করা টাও ছিলো বেশ সহজ। কারণ কাফু কিছুটা উপরে উঠে খেলতে পারেন। যা আমরা বর্তমানে মার্সেলোর মধ্যে দেখতে পারি। সাও পাওলো দলে নিয়মিত হবার পর জাতী দলে ডাক পান কাফু।

জাতীয় দলে ডাক পাবার সময়টা ছিলো ১৯৯০। মাত্র ২০ বছর বয়সেই জাতীয় দলে সুযোগ পান কাফু। ২০১৭ সালে কাফু তাঁর ক্যারিয়ারকে পরিবর্তন করে দেয়া টেলে সান্টানাকে নিয়ে বলেন, ‘আমি প্রথম রাইট ব্যাক হিসেবে খেলতে পছন্দ করতাম না। আমি রাইট ব্যাক হিসেবে শিখেছিলাম কিভাবে ভিন্নভাবে ক্রস করতে হয়। ১৯৯০ সালে যখন পাওলো রবার্তো ফ্যালকাও আমাকে জাতীয় দলে ডাকেন তখন আমি বুঝতে পারি সান্টানা সঠিক ছিলেন। সেলেসাওদের হয়ে মাঠে নামার থেকে ভালো কিছু হতে পারে না।’

জাতীয় দলে সুযোগ পাবার দুই বছর পর বিশ্বের অন্যতম সেরা রাইট ব্যাক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন কাফু। এই সময়ে পালমেইরাসের বিপক্ষে দূর্দান্ত খেলেন তিনি। প্রথম লেগের ম্যাচে পালমেইরাসের বিপক্ষে ৪-২ গোলে জয় পায় সাও পাওলো। এই চার গোলে অবদান ছিলো কাফুর। প্রথম গোল তিনি নিজে করেছিলেন। আর পরবর্তী দুই গোলে দূর্দান্ত সহযোগিতা করেছিলেন তিনি। আর সর্বশেষ গোল করেছিলেন পেনাল্টি থেকে। তাঁর এই অবদানে সাও পাওলোর ব্রাজিলিয়ান লিগের ১৮তম শিরোপা জয় কিছুটা হলেও নিশ্চিত হয়। কারণ দ্বিতীয় লেগে পালমেইরাসের ঘুরে দাঁড়ানো সুযোগ ছিলো না।

পালমেইরাসের বিপক্ষে ম্যাচের এক সপ্তাহ পর টোকিওতে ক্লাব বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয় বার্সেলোনা এবং সাও পাওলো। তখন বার্সেলোনার কোচ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন কিংবদন্তী ফুটবলার এবং কোচ ইয়োহান ক্রুইফ। ক্রুইফের বার্সেলোনাকে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় সাও পাওলো। এতেও অবদান ছিলো ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তী কাফুর।

মাত্র ২৪ বছর বয়সেই দুইটি কোপা লিবার্দোস কাপ, ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জিতে নেন। এছাড়াও জিতে নেন ক্যাম্পেওনাটো পুলিস্তা পুরস্কার। এর বাইরেও প্রায় ৩০ টির মত শিরোপা জিতে নেন তিনি। আর এর মাধ্যমেই সবার নজর কাড়তে শুরু করেন কাফু। যদিও তার ক্রস গুলোতে ছিলো একটু সমস্যা, শুধু তাঁর ক্রস নিয়েই একটূ তর্ক করা সম্ভব। এছাড়া তাঁর অন্য কোনো বিষয় নিয়ে তর্ক করা সম্ভব নয়। তিনি ছিলেন একজন সেরা রাইট ব্যাক। এই দূর্দান্ত পারফর্মেন্স নিয়ে যান ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে দূর্দান্ত এক বিশ্বকাপ খেলেন কাফু। যদিও মাত্র তিন ম্যাচে মাঠের নামার সুযোগ পেয়েছিলেন। এই তিন ম্যাচেই নিজেকে চিনিয়ে দেন কাফু। এই বিশ্বকাপের পরই ইউরোপের দরজা খুলে যায় তাঁর জন্য।

১৯৯৪ বিশ্বকাপের পর ব্রাজিল ছেড়ে পাড়ি জমান স্পেনে। যোগ দেন স্পেনের ক্লাব রিয়াল জারাগোজায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি তিনি। ক্যারিয়ারের উড়ন্ত সময়ে তিনি বেঞ্চে বসে থাকতে চাননি। তাই তিনি চেয়েছিলেন ব্রাজিলে ফিরে আসতে। তাঁকে দলে ভেড়াতে আগ্রহী ছিলো ব্রাজিলিয়ান ক্লাব পালমেইরাস। কিন্তু সাও পাওলো এবং রিয়াল জারাগোজার চুক্তির কারণে পালমেইরাসে আসতে পারেননি তিনি। কিন্তু ব্রাজিলে ঠিকই ফিরে আসেন তিনি। যোগ দেন ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চলের ছোটো ক্লাব জুভেন্টাইডে। এখান থেকেই আবার সঠিক পথে ফিরে আসেন কাফু।

জুভেন্টাইডের হয়ে দূর্দান্ত পারফর্মেন্স তাঁকে করে দেয় ব্রাজিলের প্রধান পছন্দের রাইট ব্যাক হিসেবে। তাঁর পারফর্মেন্সের কারণে রাইট ব্যাক পজিশনে অন্য কাউকে ভাবতে পারেননি তখনকার ব্রাজিলিয়ান কোচ। এর ফলেই সুযোগ পান ১৯৯৭ সালে বলিভিয়ায় অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকাতে। এই কোপা আমেরিকায় দূর্দান্ত ছিল ব্রাজিল দল। রোনালদো, রোমারিওদের নিয়ে গড়া আক্রমণভাগ উড়িয়ে দেয় অন্য দলের রক্ষণভাগকে। কোপা আমেরিকাতে কাফুর দূর্দান্ত পারফর্মেন্স আবারো তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে ইউরোপে। এবার যোগ দেন ইতালিয়ান ক্লাব রোমাতে।

ব্রাজিলে থাকাকালীন সময়ে যেসব কোচের অধীনে কাফু খেলেছিলেন সেখানে তিনি খেলতেন আক্রমণাত্মক ফুটবল। আর ইতালিতে এসে খেলা শুরু করেন ডিফেন্সিভ ফুটবল। এখানে এসে নিজেকে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয় কাফুর। কিন্তু তারপরও নিজেকে বেশ সফলভাবে গড়ে তোলেন কাফু। ফ্যাবিও ক্যাপেলো রোমার দায়িত্ব নেবার পর থেকে আবারো সেই আগের অবস্থানে ফিরে আসেন কাফু।

এখন শুধু ফিরে আসা নয়, আগের থেকে বেশ ক্ষুরধার হয়ে উঠেন কাফু। ফ্যাবিও ক্যাপেলোর সময়কালের গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, রিভালদোদের বলের যোগান দাতা হয়ে উঠেন কাফু। তিনি নিচ থেকে বেশ ভালো বলের যোগান দিতে পারতেন। কারণ কাফু কিছুটা মধ্যমাঠ বরাবর খেলতেন, যদিও তাঁর পজিশন ছিলো একজন রক্ষণভাগের ফুটবলার।

রোমায় দূর্দান্ত খেলা অবস্থায় ২০০২ বিশ্বকাপে যান কাফু। এই বিশ্বকাপে কাফু ছিলেন ব্রাজিলের অধিনায়ক। আর এছাড়াও এই বিশ্বকাপ ছিলো রোনালদিনহো,রোনালদো এবং রিভালদো শো। আর তাদের কল্যানেই ২০০২ সালের জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপ ঘরে তোলে ব্রাজিল। এটা ছিল এখন পর্যন্ত ব্রাজিলের সর্বশেষ বিশ্বকাপ শিরোপা। এই বিশ্বকাপে সবার নজর কাড়তে না পারলেও ব্রাজিলের রক্ষণভাগের অন্যতম ভরসা ছিলেন কাফু। আর তাঁর ভরসার জায়গাতে অটুট ছিলেন তিনি।

বিশ্বকাপ জেতার এক মৌসুম পর পাড়ি জমান ইতালিয়ান ক্লাব এসি মিলানে। এসি মিলানের হয়ে ইউরোপিয়ান ফুটবলের সম্ভাব্য সব শিরোপা জয় করেন। এসি মিলানের হয়ে জিতেন ইতালিয়ান সিরি এ, উয়েফা চ্যাম্পয়িনস লিগ, উয়েফা সুপার কাপ এবং ক্লাব বিশ্বকাপ। এসি মিলানে খেলেছেন পাওলো মালদিনি, ফিলিপ্পো ইনজাঘিদের মত তারকাদের সাথে। তাদের সাথে খেলেও নিজেকে আলাদা করে নিজেকে চিনিয়েছেন কাফু।

কাফু ছিলেন ফুটবলীয় কিংবদন্তি। রক্ষণভাগের অন্যতম সেরা ফুটবলার।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...