হারারেতে তখন সন্ধ্যা নামছে। স্কোরবোর্ডে লেখা ৯০ রানের এক পরাজয়। ভারতের ছুঁড়ে দেওয়া ২২০ রানের লক্ষ্যে জিম্বাবুয়ে গুটিয়ে গেছে মোটে ১২৯ রানে। সিরিজ তখন ২-০তে হাতছাড়া, একটা ম্যাচ বাকি থাকতেই। মাঠ ছেড়ে যাওয়ার সময় অধিনায়ক সিকান্দার রাজার কাঁধে যতটা না ব্যাটের ব্যর্থতার বোঝা, তার চেয়ে ঢের বেশি চেপে বসল আরেকটা সংখ্যা। ৭৬।
এই ৭৬ কোনো রান নয়, কোনো উইকেটও নয়। এই ৭৬ হলো এক ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারে হারের সংখ্যা। আর ঠিক এখানেই রাজা টপকে গেলেন সাকিব আল হাসানকে।
প্রশ্ন জাগে, একজন ক্রিকেটারের সবচেয়ে বড় পরিচয় কি তার জয়ের গল্প, নাকি হারের সংখ্যাও তার গল্পের অংশ হয়ে যায়? উত্তরটা বোধহয় জিম্বাবুয়ে আর বাংলাদেশের মতো দলের ক্রিকেটারদের জিজ্ঞেস করলেই মেলে।
পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি টি-টোয়েন্টি হার সঙ্গী করা ক্রিকেটারদের তালিকায় চোখ রাখলেই বোঝা যায়, এই আক্ষেপ একা রাজার নয়। শীর্ষে আছেন মাহমুদউল্লাহ, ১৪১ ম্যাচে ৮৯ হার নিয়ে। তারপরেই আয়ারল্যান্ডের পল স্টার্লিং, ৮৮ হার। জর্জ ডকরেলের নামের পাশে ৮২টা তেতো স্মৃতি। শ্রীলঙ্কার দাসুন শানাকার ৮১। আর এই মিছিলে পাঁচ নম্বরে উঠে এলেন রাজা, ৭৬ হার নিয়ে সাকিবকে (৭৫) পেছনে ফেলে।

মজার ব্যাপার হলো, এই তালিকার প্রথম এগারো জনের মধ্যে পাঁচজনই বাংলাদেশের। মাহমুদউল্লাহ, সাকিব, লিটন দাস, মুশফিকুর রহিম, মুস্তাফিজুর রহমান — সবাই আছেন এই অস্বস্তিকর ক্লাবে। যে ক্রিকেটাররা বছরের পর বছর দলের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে থেকেছেন, তাদেরই নাম সবচেয়ে বেশি ঘুরেফিরে আসছে হারের খাতায়। এ যেন এক নিষ্ঠুর সত্য— দুর্বল বা সংগ্রামরত দলের সেরা ক্রিকেটাররাই সবচেয়ে বেশি মাঠে নামেন, আর সবচেয়ে বেশি মাঠ ছাড়েন মাথা নিচু করে।
রাজার ক্ষেত্রে গল্পটা আরও করুণ। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ক্রিকেটার তিনিই। দলটার হয়ে ব্যাট করেন, বল করেন, নেতৃত্ব দেন, দলকে একা কাঁধে বয়ে বেড়ান। অথচ প্রতিদান হিসেবে জমা হতে থাকে হারের পর হার। যে মানুষটা নিজের দলের সবচেয়ে বড় শক্তি, তাকেই বইতে হয় দলের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় ভার।
ভারত সফরেও একই ছবি। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে সাত উইকেটে হার, দ্বিতীয়টায় ৯০ রানের বিশাল ব্যবধানে বিধ্বস্ত হওয়া। সিরিজ শেষ হওয়ার আগেই হাতছাড়া। শেষ ম্যাচটা শুধুই এখন সম্মান বাঁচানোর লড়াই।

তবু মাঠে নামবেন রাজা, ঠিক যেমন বছরের পর বছর নেমেছেন মুশফিকুর রহিম — বাংলাদেশের হয়ে যিনি নিজেও এই তালিকায় আছেন ৬৩ হার নিয়ে, তবু যাকে কখনো দেখা যায়নি মাঠ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে। হারের সংখ্যা যত বাড়ে, ছোট দলের বড় ক্রিকেটারদের কাছে সেটা লজ্জার নয়, বরং হয়ে ওঠে দায়িত্বের আরেক নাম। কারণ তারা জানেন, দল হারলেও লড়াইটা চালিয়ে যাওয়ার মানুষ কমই থাকে — আর সেই কমজনদের একজন হয়েই থেকে যেতে চান তারা।











