বিখ্যাত ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একবার লিখেছিলেন, ‘পাশের বাড়ির মেয়েটি যদি কবিতা না ভালোবেসে ক্রিকেট ভালোবাসতো, তাহলে আমি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় না হয়ে গাভাস্কার হতাম!’
ক্রিকেটের মহাকাব্যে ‘লিটল মাস্টার’ বললে সবার আগে শচীন টেন্ডুলকারের কথা মনে পড়ে। তবে এই উপাধির আসল ও প্রথম মালিক ছিলেন সুনিল মনোহর গাভাস্কার। শচীনের বহু আগেই ভারতীয় ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে শির উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলেন এই ‘অরিজিনাল লিটল মাস্টার’।
সত্তরের দশকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফাস্ট বোলাররা পিচে আগুন ঝরাতেন। মাইকেল হোল্ডিং কিংবা জোয়েল গার্নারদের বাউন্সার ছিল একেকটি নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র। আধুনিক যুগের সুরক্ষা সামগ্রী তো দূরের কথা, গাভাস্কারের মাথায় কোনো হেলমেটই থাকত না। সাধারণ একটি কাপড়ের ক্যাপ পরে বিশ্বের সবচেয়ে বিধ্বংসী পেস আক্রমণের মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন তিনি।

অভিষেক সিরিজেই পোর্ট অব স্পেনে তাঁর সাহসিকতার এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটেছিল। সিরিজের শেষ টেস্টের আগে গাভাস্কারের দাঁতে তীব্র ক্যাভিটির ব্যথা শুরু হয়, বরফজল লেগে যা তীব্র যন্ত্রণা তৈরি করে।
কিন্তু কোনো ব্যথানাশক বা ঘুমের ওষুধ নেওয়ার সুযোগ ছিল না, কারণ এতে রিফ্লেক্স বা চোখের তীক্ষ্ণতা কমে যেতে পারে। সেই অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে, এক ফোঁটা ওষুধ না খেয়ে তিনি টানা পাঁচ দিন ব্যাট করে দুই ইনিংসে ১২৭ ও ২২০ রান করেন। ভারতকে প্রথমবার ক্যারিবীয়দের মাটিতে টেস্ট সিরিজ বিজয়ের ঐতিহাসিক গৌরব এনে দিয়ে তবেই চিকিৎসকের চেয়ারে বসেছিলেন তিনি।
১৯৮৩ সালে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভেঙে ২৯তম টেস্ট সেঞ্চুরি ছোঁয়া কিংবা ১৯৮৭ সালে টেস্ট ইতিহাসের প্রথম ব্যাটার হিসেবে দশ হাজার রানের পাহাড় জয়।সবই এসেছে তাঁর বীরত্বগাথা থেকে।
১৯৮২-৮৩ সালে পাকিস্তান সফরে ইমরান খান ও সরফরাজ নওয়াজের রিভার্স সুইং যখন বিশ্বের যেকোনো ব্যাটারের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল, তখনও গাভাস্কার একা মাটি কামড়ে ক্রিজে পড়ে থেকে লড়াই চালিয়েছেন। ১৯৮৬ সালে তো ইমরান খান নিজে গাভাস্কারকে অবসর নেওয়ার পরিকল্পনা থেকে ফিরিয়ে এনে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছিলেন, ‘তুমি এখনই অবসর নিতে পারো না, আমি ভারতের মাটিতে ভারতকে হারাতে চাই আর তুমি না থাকলে সেই জয়ের কোনো স্বাদ থাকবে না।’

৩০টির বেশি সেঞ্চুরি আর দশ হাজার রানের মালিককে আন্ডাররেটেড বলাটা অদ্ভুত শোনানো স্বাভাবিক। কিন্তু গাভাস্কারের আসল অবদান শুধু এই পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা অসম্ভব। তিনি যখন ওপেন করতে নামতেন, তখন ভারতীয় দলের বাকি ব্যাটিং লাইনআপ ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। তাই কোনো বিকল্প ছাড়া, আক্ষরিক অর্থেই পুরো দেশের আশা-আকাঙ্ক্ষার বোঝা তাকে একা কাঁধে বইতে হতো।
পরবর্তী যুগে বিশ্ব ক্রিকেট যখন চার-ছক্কার রঙিন গ্ল্যামার আর দ্রুতগতির ফরম্যাটে মেতে ওঠে, তখন গাভাস্কারের সেই ধ্রুপদী, রক্ষণাত্মক ও দীর্ঘ ধৈর্যশীল ব্যাটিং কিছুটা আড়ালে পড়ে যায়। আধুনিক ক্রিকেটভক্তরা আগ্রাসী ব্যাটারদের সহজেই মাথায় তুলে নেয়, কিন্তু যে শক্ত ভিত্তির ওপর ভর করে আজকের ভারত ক্রিকেটবিশ্বের অর্থনৈতিক ও পারফর্ম্যান্সের পরাশক্তি হয়ে উঠেছে, তার প্রথম শক্ত ইটগুলো গেঁথেছিলেন এই নি:সঙ্গ যোদ্ধা।
কোনো আধুনিক সেফটি গার্ড ছাড়া, বিষাক্ত পিচে বিশ্বের সর্বকালের সেরা পেসারদের মুখোমুখি হয়ে দিনের পর দিন ব্যাট হাতে দাঁড়ানো সুনিল গাভাস্কার তাই শুধুই একজন কিংবদন্তি নন। তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের ব্যাকরণে রাজাধিরাজ, ‘গড অব গডস’।












