আবুধাবির প্রখর রোদে এবার ইতিহাসকে অমর করার অপেক্ষা!

২০২১ সালে মুমিনুল হক একটা সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিন পেসার নিয়ে খেলা, পেসারদের সহায়ক উইকেট বানানো, স্পিননির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা। তখন অনেকের কাছেই এটা ছিল ঝুঁকি, অথচ সেই ঝুঁকিই আজ বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের নাম।

২০২১ সালে মুমিনুল হক একটা সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিন পেসার নিয়ে খেলা, পেসারদের সহায়ক উইকেট বানানো, স্পিননির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা। তখন অনেকের কাছেই এটা ছিল ঝুঁকি, অথচ সেই ঝুঁকিই আজ বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের নাম।

২০২৪ সালে এসে সেই যাত্রার ফল চোখে পড়ল। রাওয়ালপিন্ডির ব্যাটিংবান্ধব পিচ, পেসারদের জন্য প্রায় কিছুই না থাকা উইকেটে বাংলাদেশের পেসাররা প্রথমবারের মতো প্রতিপক্ষের এক ইনিংসের সবগুলো উইকেট একাই নিলেন, হাসান মাহমুদ পাঁচটি, নাহিদ রানা চারটি আর তাসকিন আহমেদ একটি। ঘরের মাঠে যে মিরপুরে বরাবর স্পিনই ছিল প্রথম ভরসা, সেখানেও ২০২৬ সালের মে মাসে পাকিস্তানকে হারানো টেস্টে পেসাররা নিলেন ১০ উইকেট। আর আগস্টে ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বাউন্স আর গতির কন্ডিশনে পেসাররা প্রথম ইনিংসের ১০ উইকেটই নিলেন, হাসান নিলেন ৫৫ রানে ৬ উইকেট, যা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো বাংলাদেশি বোলারের প্রথম পাঁচ উইকেট।

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের পেছনে পেসারদের ১৪ উইকেট ছিল, যা বাংলাদেশি পেসারদের এক টেস্টে যৌথ সর্বোচ্চ। মানে ব্যাটিং স্বর্গের ফ্ল্যাট উইকেট, স্পিনের ঘরোয়া মঞ্চ আর বাউন্সি বিদেশি পিচ, তিন ধরনের কন্ডিশনেই বাংলাদেশের পেসাররা নিজেদের প্রমাণ করে ফেলেছেন।

সংখ্যাগুলোও এখন নিজেরাই কথা বলে। নাহিদ রানা ২০২৪ সালের মার্চে অভিষেকের পর টেস্টে ৩৮ উইকেট নিয়েছেন, তাঁর গতি ১৫০ কিলোমিটারের বেশি ছুঁয়েছে, যা এক সময় বাংলাদেশি বোলারদের কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। হাসান মাহমুদের টেস্ট উইকেট ৪৫, তিনটি পাঁচ উইকেটের ইনিংস, যার একটি করে পাকিস্তান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ায়।

তাসকিন অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে পর্যন্ত টেস্টে ৫৫ উইকেট নিয়েছিলেন, ২০২৪ সালের নভেম্বরে অ্যান্টিগায় এক ইনিংসেই নিয়েছিলেন ছয় উইকেট। এক সময় বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে মাশরাফি বিন মুর্তজা (৭৮) আর শাহাদাত হোসেন (৭২) ছাড়া কোনো পেসার ৫০ উইকেটও পাননি, সেই দেশে এখন একসঙ্গে একাধিক পেসার টেস্টে নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেছেন।

এই সাফল্যের আসল শক্তি হলো, এটা কারও একার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। কোথাও হাসান, কোথাও নাহিদ, কোথাও তাসকিন বা শরিফুল ইসলাম, ইবাদত হোসেনও সময়মতো নিজের কাজটা করে দিয়েছেন। ডারউইনে হাসান প্রথম ম্যাচে নিলেন ৯ উইকেট, ২য় ম্যাচে শরিফুল নিলেন ৭ উইকেট। কেউ চোটে পড়লে আরেকজন জায়গাটা পুর্ণ করেন, দল ঘাটতিটা টেরও পায় না। মুমিনুলের হাত ধরে শুরু হওয়া এই পথ নাজমুল হোসেন শান্তর অধিনায়কত্বেও একই ধারায় এগিয়েছে, শান্তও পেসারদের ওপরই ভরসা রেখেছেন, আর পেসাররা সেই ভরসার মর্যাদা দিয়েছেন।

এবার সেই গভীরতার পরীক্ষাটা হতে যাচ্ছে সবচেয়ে কঠিন কন্ডিশনে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৯ থেকে ১৩ অক্টোবর আবুধাবির শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামের একমাত্র টেস্টে তাসকিনকে বিশ্রামে রাখা হয়েছে, চোট কাটিয়ে ওঠা নাহিদও দলে নেই। পেস আক্রমণের দায়িত্ব হাসান মাহমুদ, খালেদ আহমেদ, ইবাদত হোসেন আর শরিফুলের কাঁধে। কন্ডিশনও একেবারে আলাদা।

এই মাঠে টেস্টে প্রথম ইনিংসের গড় রান প্রায় ৩৬০, চতুর্থ ইনিংসে সেটা নেমে আসে দেড়শর আশপাশে, মানে উইকেট ধীরে ধীরে স্পিনারদের হাতে চলে যায়। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির বেশি আর আর্দ্রতা বেশি থাকলে উইকেট আরও স্লো হয়, সবুজ ঘাস, বাউন্স বা সুইং বলে কিছুই থাকে না। এখানে টেস্টে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারির তালিকায় আছেন ইয়াসির শাহর মতো স্পিনার, যদিও পাকিস্তানের জুনায়েদ খান ২০১৪ সালের হিসাবে ১৮ উইকেট নিয়ে দেখিয়েছিলেন, গতির বদলে লাইন, লেংথ আর রিভার্স সুইং দিয়েও এখানে সফল হওয়া যায়। বাংলাদেশের পেসারদের কাছে তাই আসল পরীক্ষাটা গতির নয়, ধৈর্য আর কৌশলের।

এই পরীক্ষায় উতরে গেলে আমাদের আর দ্বিধা করার কিছু থাকবে না। রাওয়ালপিন্ডির ফ্ল্যাট উইকেট, ঘরের মাঠ, অস্ট্রেলিয়ার বাউন্স, সবই তো পেসাররা আগেই সামলে দেখিয়েছেন, বাকি ছিল শুধু আমিরাতের এই স্লো আর প্রাণহীন উইকেট। সেখানেও যদি বাংলাদেশের পেস ইউনিট ভালো করে, তাহলে বুক ফুলিয়েই বলা যাবে, বিশ্বের প্রায় যেকোনো পিচে বাংলাদেশের বোলাররা এখন সেরাদের কাতারে। ২০২১ সালে মুমিনুল যে বাজিটা ধরেছিলেন, তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হবে সেটাই, কারণ তখন আর কেউ বলতে পারবে না এটা দু-এক ম্যাচের ঝলক ছিল, এটা হবে পুরো একটা ইউনিটের সেরা হয়ে ওঠার গল্প।।

লেখক পরিচিতি

আমজাদ হোসেন আবির

সাব এডিটর

Share via
Copy link