টেস্ট ক্রিকেটের শান্ত পরিবেশকে মূহূর্তের মধ্যে এক লহমায় তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা যাঁর ছিল, তিনি ম্যাথু হেইডেন। ২০০১ সালের চেন্নাই টেস্ট। যেখানে টার্ন আর বাউন্সের মায়াজালে ব্যাটারদের ত্রাস হয়ে আগুন ঝরাচ্ছেন হরভজন ও কুম্বলে জুটির স্পিন বিষ। বিশ্বের বাঘা বাঘা নামগুলো যখন ঘূর্ণি পিচে কেবল টিকে থাকার করুণ লড়াইয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই বাইশ গজে পা রাখলেন এক অজি টাইটান।
স্পিন খেলার চিরাচরিত সমস্ত ব্যাকরণকে পদদলিত করে তিনি ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। আর একের পর এক বিধ্বংসী সুইপ শটে বল আছড়ে ফেলতে লাগলেন গ্যালারিতে। ঘূর্ণি উইকেটের ফাঁদ ছিন্ন করে ভারতীয় বোলারদের এমন হাড়িকাঠে তোলার দু:সাহস কেবল হেইডেনের পক্ষেই সম্ভব ছিল।
অথচ এই অজি টাইটানের টেস্ট ক্যারিয়ারের অঙ্কুরেই নেমে এসেছিল বিনাশের উপক্রম। ১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভিষেকের পর শর্ট বল আর অফ স্পিনের দুর্বলতা তাঁকে একসময় ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল একাদশের সীমানা পেরিয়ে। দল থেকে ছিটকে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া লিগ আর কাউন্টি ক্রিকেটের অন্তহীন ঘাম ঝরানোর আঁধারে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০০০ সালে যখন তিনি আবার হলুদ জার্সিতে ফিরলেন, ততক্ষণে বাইশ গজে উদয় হয়েছে এক অপ্রতিরোধ্য দানবের।

সেই দানবের ক্যারিয়ারের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল রত্নটি যুক্ত হলো ২০০৩ সালের অক্টোবরে, পার্থের ওয়াকা স্টেডিয়ামে। পেসারদের ভয়ংকর স্বর্গরাজ্যে দাঁড়িয়ে তিনি খেললেন টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম মহাকাব্যিক এক ইনিংস। ৩৮০ রানের অবিশ্বাস্য প্রদর্শনী। ব্রায়ান লারার মুকুট কেড়ে নিয়ে বিশ্বমঞ্চে তখন রচিত হলো নতুন এক ইতিহাস।
টেস্টের এই ত্রাসের আরেকটি রূপ দেখা গিয়েছিল ওয়ানডে মঞ্চেও। বিশেষ করে ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে। আগের আসরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে সেন্ট কিটসের সবুজ উইকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিনি যেভাবে চড়াও হয়েছিলেন, তা পুরো টুর্নামেন্টের সুরটাই বেঁধে দিয়েছিল। শন পলক কিংবা মাখায়া এনটিপির গতির ঝড়কে চোখের পলকে তুচ্ছ করে তাঁর সেই ধ্বংসাত্মক ব্যাটিং ছিল গতির বিরুদ্ধে শিল্পের এক অপূর্ব বিদ্রোহ।
আর এই অদম্য কৌতূহল ও উদ্ভাবনী শক্তির চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ২০১০ সালের আইপিএলে। চেন্নাই সুপার কিংসের হলুদ জার্সিতে প্রথাগত ব্যাটকে দূরে ঠেলে হঠাৎ করেই তিনি যখন অদ্ভুতদর্শন ‘মুঙ্গুজ ব্যাট’ হাতে মাঠে নেমে পড়লেন, তখন পুরো ক্রিকেট বিশ্ব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। নিচের অংশ লম্বা সেই খাটো হ্যান্ডেলের ব্যাট দিয়ে দিল্লির বোলারদের কচুকাটা করে মাত্র ৪৩ বলে ৯৩ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেললেন তিনি।

অস্ট্রেলিয়ার অপরাজেয় সোনালী যুগের এই অবিসংবাদিত সেনানী বাইশ গজে কেবল রান বা সেঞ্চুরির পাহাড় গড়েই ক্ষান্ত হননি। আগ্রাসন আর শিল্পের এমন এক অপূর্ব মেলবন্ধন তিনি তৈরি করে গেছেন, যা আধুনিক টেস্ট ওপেনিংয়ের মানদণ্ড হয়ে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবে ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে।











