কোহলি-রোহিতের সাম্রাজ্যে নতুন রাজা? 

বিরাট কোহলি আর রোহিত শর্মা ভারতীয় ক্রিকেটকে যে উচ্চতায় রেখে যাচ্ছেন, সেখান থেকে আরও ওপরে ওঠার স্বপ্ন দেখছে নতুন প্রজন্ম। সেই স্বপ্নের দুই সারথী মুখ অভিষেক শর্মা ও বৈভব সুরিয়াভানশি।

ইতিহাস বলে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দেয় বারবার। শচীন টেন্ডুলকার ও সৌরভ গাঙ্গুলিরা যে জায়গায় ভারতীয় ক্রিকেটকে রেখে গিয়েছিলেন, বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মারা সেটাকে আরও উঁচুতে নিয়ে গেছেন। বিশেষ করে ওয়ানডে ক্রিকেটে ভারতকে তাঁরা নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়। এখন প্রশ্ন, পরের ধাপটা কারা তৈরি করবেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই সামনে আসে অভিষেক শর্মা ও বৈভব সুরিয়াভানশির নাম। দুজনের ব্যাটিংয়েই আছে এমন এক আগ্রাসন, যা আধুনিক ক্রিকেটের বদলে যাওয়া চেহারাটাকে তুলে ধরে।

যদিও, দুজনের একজন মূলত টি-টোয়েন্টিতে নিজের পরিচয় গড়েছেন, অন্যজন কেবল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেই সবে পা রাখছেন। সেখানে ভারতীয় ক্রিকেটের তিন সংস্করণে নিজেদের প্রমাণ করা বিরাট-রোহিতের উত্তরসূরি হিসেবে তাঁদেরই সামনে আনা কতটা যুক্তিযুক্ত? তাঁদের নিয়ে আলোচনাটা অন্য জায়গায়। তাঁরা কি এমন এক ক্রিকেট যুগের প্রতিনিধি, যেখানে আগ্রাসনের সংজ্ঞাটাই বদলে যাচ্ছে।

বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মার যুগেও আক্রমণ ছিল। তবে সেই আক্রমণের ধরন ছিল পরিস্থিতি বুঝে। রোহিত নিজের ব্যাটিং দিয়ে পাওয়ার প্লের হিসাব পাল্টেছেন। বিরাট দেখিয়েছেন, ম্যাচের চাহিদা বুঝে কখন গতি বাড়াতে হয়, কখন ইনিংস ধরে রাখতে হয়। তাঁদের সাফল্যের বড় জায়গা ছিল এই ভারসাম্য। তাঁরা শুধু রান করেননি, দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে দলকে জেতানোর অভ্যাস তৈরি করেছেন।

অভিষেক শর্মা ও বৈভব সুরিয়াভানশির ব্যাটিংয়ে চোখে পড়ে অন্য এক প্রবণতা। এখানে শুরু থেকেই প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার চেষ্টা। পাওয়ার প্লে যেন শুধু ইনিংসের প্রথম ছয় ওভার নয়, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ। বোলার কে, মাঠের আকার কেমন, প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা কী, এসবের হিসাবের মধ্যেও তাঁরা আক্রমণের পথ খোঁজেন। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে পাওয়ার প্লেতে ১১৮ রান করার সেই উদাহরণ এই মানসিকতাকেই সামনে আনে।

তবে এই দুজনের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সই গল্পের শেষ কথা নয়। তাঁদের ঘিরে আলোচনার আসল কারণ, তাঁরা এমন এক ক্রিকেটের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যেখানে ব্যাটিংয়ের গতি আরও বেড়েছে, ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা আরও স্বাভাবিক হয়েছে এবং প্রতিপক্ষকে শুরু থেকেই চাপে রাখার চেষ্টা আরও জোরদার হয়ে উঠেছে।

এখানেই ভারতীয় ক্রিকেটের পরবর্তী স্তরে ওঠার সম্ভাবনা। শচীন-সৌরভদের সময় ভারত নিজেদের শক্ত ভিত তৈরি করেছে। বিরাট-রোহিতরা সেই ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে আধিপত্যের নতুন মানদণ্ড গড়েছেন। এখনকার প্রজন্মের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু সেই সাফল্য ধরে রাখা নয়। ক্রিকেট যেদিকে এগোচ্ছে, সেখানে নিজেদের আরও কার্যকর করে তোলা। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টিতে যে আগ্রাসন এখন দেখা যাচ্ছে, তা অন্য সংস্করণেও প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সেটাও দেখার বিষয়।

অবশ্য আগ্রাসনের একটা সীমাবদ্ধতা আছে। সব উইকেট এক রকম নয়, সব বোলিং আক্রমণও এক নয়। প্রতি ম্যাচে শুরু থেকেই আক্রমণ করতে গেলে ব্যর্থতার ঝুঁকি থাকবেই। আর টি-টোয়েন্টিতে সফল হওয়া মানেই টেস্ট কিংবা ওয়ানডেতেও একইভাবে সফল হওয়া নয়। অভিষেক ও বৈভবকে তাই আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকতা, কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং বড় ম্যাচে নিজেদের প্রমাণ করার পরীক্ষাও তাঁদের সামনে আসবে।

তারপরও তাঁদের নিয়ে কথা বলার কারণ আছে। ক্রিকেটের প্রতিটি যুগে এমন কিছু ক্রিকেটার আসেন, যাঁরা শুধু ভালো খেলেন না, খেলাটাকে দেখার চোখও বদলে দেন। অভিষেক ও বৈভব সেই পরিবর্তনের দুই সম্ভাব্য মুখ। তাঁরা শেষ পর্যন্ত ভারতীয় ক্রিকেটের পরবর্তী যুগের প্রধান প্রতিনিধি হবেন কি না, সেটা সময় বলবে। তবে তাঁদের ব্যাটিংয়ে যে আগ্রাসী ক্রিকেটের নতুন ভাষা দেখা যাচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মা ভারতীয় ক্রিকেটকে যে উচ্চতায় রেখে যাচ্ছেন, সেখান থেকে আরও ওপরে ওঠার জন্য শুধু নতুন তারকা যথেষ্ট নয়। দরকার নতুন মানদণ্ড, নতুন ধারাবাহিকতা এবং বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার ক্ষমতা।

অভিষেক ও বৈভব সেই নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারবেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তাঁরা কি শুধু টি-টোয়েন্টির দুই বিস্ফোরক ব্যাটার হয়ে থাকবেন, নাকি ভারতীয় ক্রিকেটের পরবর্তী যুগকে সংজ্ঞায়িত করবেন? উত্তর জানতে সময়ের অপেক্ষা করতেই হচ্ছে।

Share via
Copy link