বুয়েনস আইরেসের ধুলোমাখা ভিয়া ফিওরিতো নামক এক জনপদ, যেখানে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী আর আকাশটা ছিল বিবর্ণ। সেই বিবর্ণ ক্যানভাসে শৈশবেই আলো ছড়াতে শুরু করেছিল এক ধূমকেতু – ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কশাঘাত যার শৈশবকে কুঁকড়ে দিতে চেয়েছিল, ফুটবল পায়ে তিনি সেই অভাবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হয়ে উঠলেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মায়ার কারিগর।
‘মায়া’! ডিয়েগোর ফুটবলকে বোঝাতে এর চেয়ে সুন্দর শব্দ আর কী হতে পারে? রোগ, শোক, ক্ষুধা, হতাশা আর বেঁচে থাকার হাজারো যন্ত্রণায় ভরা পৃথিবীটাকে যুগের পর যুগ একজোড়া জীর্ণ বুট, একটা বাঁ পা আর একটা ফুটবলের মায়ায় ভুলিয়ে রেখেছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তাঁর পায়ের জাদুতে মানুষ ভুলে যেত দুঃখ, ভুলে যেত অভাব। ফুটবল তখন আর নিছক একটা খেলা থাকত না, হয়ে উঠত বেঁচে থাকার আনন্দ, মুক্তির স্বপ্ন, কোটি মানুষের ভালোবাসার আশ্রয়। যে মায়া আজও ফুরায়নি।
ম্যারাডোনার জীবনের আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি খচিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে। অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচা সেদিন সাক্ষী হয়েছিল ফুটবলের দুই মেরুর – স্বর্গ ও নরকের। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই অবিস্মরণীয় কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ। ম্যাচের প্রথম গোলটি এল ‘ঈশ্বরের হাত’ ছুঁয়ে, যা মানবীয় ধূর্ততা আর রূপকথার এক অপূর্ব মিশ্রণ।

কিন্তু তার রেশ কাটতে না কাটতেই ডিয়েগো জন্ম দিলেন ইতিহাসের নিখাদ এক কবিতার। মাঝমাঠ থেকে শুরু হলো তাঁর সেই মহাকাব্যিক একক দৌড়। পিটার বেয়ার্ডলি, পিটার রিড, টেরি বুচারদের খড়কুটোর মতো উড়িয়ে, সময়ের স্রোতকে থামিয়ে দিয়ে গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে কাটিয়ে বল যখন জালে জড়াল, ফুটবল বিশ্ব দেখল শতাব্দীর সেরা শিল্পকর্ম।
ধারাভাষ্যকার ভিক্টর উগো মোরালেসের কণ্ঠে সেদিন প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, ‘হে! গ্রহের কোন গোলকধাঁধা থেকে এলে তুমি?’ ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ধুলোয় মিশিয়ে যখন তিনি সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরলেন, মনে হলো আকাশের চাঁদটি নেমে এসেছে এক লাতিন তরুণের হাতের মুঠোয়। ক্লাব ফুটবলে তাঁর গল্পটা ছিল আরও বেশি রূপকথার, যেখানে তিনি হয়ে উঠেছিলেন শোষিতদের মসিহা। উত্তর ইতালির অহংকারী ও বিত্তশালী ক্লাবগুলোর সামনে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি দক্ষিণ ইতালির অবহেলিত নেপলসের হয়ে।
নাপোলিকে জিতিয়েছিলেন তাদের ইতিহাসের প্রথম দুটি সেরি আ শিরোপা। নেপলসের অলিগলি সেদিন ম্যারাডোনার নামে স্লোগানে মুখরিত হয়েছিল, তাকে পুজো করেছিল দেবদূত বানিয়ে। মানুষ বলত, নেপলসের মানুষের ঘরের ছাদ ফুটো হতে পারে, কিন্তু তাদের দেওয়ালে ডিয়েগোর ছবি কখনো ধুলো জমতে পারে না।

তবে ম্যারাডোনা মানেই তো আলো আর অন্ধকারের চিরন্তন দ্বৈরথ। গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়কদের মতো তাঁর জীবনও ছিল উত্থান-পতন, বিতর্ক আর ভুলের এক দীর্ঘ গোলকধাঁধা। মাঠে যেমন ছিলেন সুরের জাদুকর, মাঠের বাইরে তেমনই মানবীয় দুর্বলতার চোরাবালিতে জর্জরিত। কিন্তু তাঁর এই পতন তাঁর মহিমাকে এতটুকু ম্লান করতে পারেনি। বরং তাঁর ক্ষতবিক্ষত জীবন তাকে মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল। তিনি ছিলেন রক্ত-মাংসের এক কবি, যিনি ভুলের কালি দিয়েও ভালোবাসার অমর কাব্যকথা লিখে গেছেন।
অরক্ষিত সেই শরীরটা ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর চিরতরে ঘুমিয়ে পড়ার পর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল লাতিন আমেরিকার হৃদয়। বুয়েনস আইরেসের বাতাস ভারী হয়েছিল কান্নায়, আর নেপলসের চার্চগুলোর মোমে গলে পড়েছিল অজস্র দীর্ঘশ্বাস।
কিন্তু যে মানুষটি তাঁর জাদুকরি পায়ে কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর কি মৃত্যু আছে? তিনি তো কোনো নশ্বর মানব নন, বরং এক মায়াবী সুর। যে সুর একবার বেজে উঠলে যুগ পেরিয়েও তার প্রতিধ্বনি হারিয়ে যায় না। আজ যতদিন ঘাস সবুজ থাকবে, যতদিন গোধূলির আলোয় একটি শিশু মলিন পায়ে বল নিয়ে ছুটবে, ততদিন মহাকালের ললাটে অমর হয়ে জ্বলবে সেই সোনালী বালকের নাম। যিনি অজস্র ভালোবাসার সুতোয় বুনে দিয়ে গেছেন অনন্তকালের এক অবিনশ্বর কাব্য।












