একবার ভাবুন তো, সকালে শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ শিক্ষার্থীদের অঙ্ক করাচ্ছেন । বোর্ডে সমাধান করছেন জটিল সব সমীকরণ। অথচ কয়েক দিন পরই সেই মানুষকে দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মাঠে। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনিই যেন সর্বেসর্বা! স্যাম নোগাইস্কি। বাংলাদেশের সঙ্গেও যার রয়েছে দারুণ এক যোগসূত্র।
গত বছর নভেম্বরেই বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড টেস্ট সিরিজ দিয়ে টেস্ট আম্পায়ার হিসেবে অভিষেক হয় এই অস্ট্রেলিয়ানের। সিলেটের পর মিরপুর টেস্টেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এবার বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার টেস্ট দিয়ে আবারও ফিরেছেন লাল-সবুজের দেশে! মজার ব্যাপারটা এখানেই, তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম তিনটি আন্তর্জাতিক টেস্টই পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশের মাটিতে।
৪৭ বছর বয়সী নোগাইস্কির পেশাগত পরিচয় হিসেবে তাঁর লিংকড-ইন প্রোফাইলে নিজেকে কেবল আম্পায়ারই নন, তিনি একজন গণিতের শিক্ষক হিসেবেও পরিচয় দিয়েছেন। তাসমানিয়ার রাজধানী হোবার্টে বেড়ে ওঠা নোগাইস্কি মাত্র ২১ বছর বয়সে শিক্ষকতা শুরু করেন। বর্তমানে দ্য হাচিন্স স্কুলে দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে মাধ্যমিক পর্যায়ের গণিত পড়াচ্ছেন। তাই চাইলেই তাঁকে একজন খাঁটি অলরাউন্ডারও বলতে পারেন।

ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা অবশ্য ছোটবেলা থেকেই। একসময় তাসমানিয়ান প্রিমিয়ার ক্রিকেটে ক্ল্যারেন্স ক্লাবের হয়ে অলরাউন্ডার হিসেবে খেলতেন। স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে একদিন ক্রিকেটার হবেন। কিন্তু ১৮ বছর বয়সে পাওয়া চোটে এক বছর মাঠের বাইরে থাকতে হয়। আর তাতেই কি না স্বপ্ন পূরণ ফিঁকে হতে থাকে আস্তে-ধীরে! কিন্তু একটা দরজা বন্ধ হলেই কি আর সব হয়ে যায় শেষ? ভাগ্যের লিখন না যায় খন্ডন। সেই সময়ই পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করেন আম্পায়ারিং।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নোগাইস্কি বলেছিলেন, ‘আবার খেলায় ফিরেছিলাম। কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর পর বুঝলাম, আমার আসল টানটা আম্পায়ারিংয়ের দিকেই। সত্যি বলতে, খেলোয়াড় হিসেবে আমি যতটা ভালো, তার চেয়ে ভালো আম্পায়ারিংয়ে।’
এরপর ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় আম্পায়ার প্যানেলে জায়গা করে নেন তিনি। ২০১৬ সালে যুক্ত হন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক প্যানেলে। ভারতের রঞ্জি ট্রফিতেও আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

আম্পায়ারিংয়ে স্বীকৃতিও পেয়েছেন একাধিকবার। ২০১১ ও ২০১২ সালে হয়েছেন তাসমানিয়ার বর্ষসেরা আম্পায়ার। এরপর ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টানা তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার বর্ষসেরা আম্পায়ার।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা শুরু ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে প্রায় নয় বছর। এই দীর্ঘ সময়ে নিজের ক্যারিয়ারও করেছেন শক্তপোক্ত! ছেলেদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত মাঠের আম্পায়ার হিসেবে ৬৯টি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন, টিভি আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আরও ১৭ ম্যাচে।
আম্পায়ারিং ক্যারিয়ারে অভিজ্ঞতার ঝুলিটা বেশ সমৃদ্ধ। আর সেই অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ওপর ভরসা রেখেই আইসিসি নোগোইস্কির ওপর আস্থা রেখেছে।ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও প্রিয় খেলাটির সঙ্গেই নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন স্যাম নোগাইস্কি। জীবন তো এমনই, নানাভাবে সাজায় গল্পের নতুন নতুন উপাখ্যান!












