বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েও বাড়ি ফিরলেন না। বরং জেদটা বেড়ে গেল। সেদিন দিল্লির তীব্র শীতে ৯০ রানের সেই অমর ইনিংস খেলার দিনই ক্রিকেট বিশ্ব টের পেয়েছিল, বাইশ গজের মায়াজালে পা রাখা বিরাট কোহলি কোনো সাধারণ নক্ষত্র নন। সে এসেছে মহাকালের বুকে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করতে।
সেই অনমনীয় জেদ আর বুকভরা সাহস তাঁকে ২০০৮ সালে মালয়েশিয়ার মাটিতে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের মুকুট এনে দিয়েছিল। যুব ক্রিকেটের সুবর্ণ তোরণ পেরিয়ে মূল জাতীয় দলের রোদে পা রাখতেই তিনি হয়ে উঠলেন অদম্য আগ্রাসনের প্রতিমূর্তি।
এরপর ২০১২ সালের সেই ঐতিহাসিক হোবার্ট রাত। যেখানে শ্রীলঙ্কার দেওয়া ৩২০ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে পৌঁছাতে হলে মাত্র ৪০ ওভারের মধ্যে টপকানোর সমীকরণ। লসিথ মালিঙ্গার এক ওভারে ২৪ রানসহ ৮৬ বলে ১৩৩ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে তিনি ভারতকে এনে দিয়েছিলেন অবিস্মরণীয় এক জয়।
জীবনের রথ অবশ্য সবসময় সমান তালে চলে না। ২০১৪ সালের ইংল্যান্ড সফরে জেমস অ্যান্ডারসনের সুইংঝড়ে যখন তাঁর ব্যাট মুখ থুবড়ে পড়ল, তখন চারপাশের বাতাসে ভেসেছিল পতনের সুর। কিন্তু রাজারা তো সিংহাসন হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়েন না, তাঁরা ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ডানা মেলেন।

সেই ব্যর্থতার জঞ্জাল ঝেড়ে ফেলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিতে চার চারটি শতকের পাহাড় গড়ে তিনি জানান দিয়েছিলেন তাঁর রাজকীয় প্রত্যাবর্তন। ২০১৬ সালের আইপিএলে বেঙ্গালুরুর জার্সিতে একাই চার শতক আর ৯৭৩ রানের মহাকাব্য কিংবা একই বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মোহালির সেই ৮২ রানের মনমুগ্ধকর মাস্টারপ্লাস তাঁর মুকুটে যোগ করেছিল নতুন দ্যুতি।
তবে নিয়তির নিষ্ঠুর লিপিতে ২০১৯ সালের পর থেকে নেমে এসেছিল প্রায় তিন বছরের এক দীর্ঘ অমাবস্যা। যেখানে ব্যাট থেকে হারিয়ে গিয়েছিল শতকের দেখা। অধিনায়কত্বের জটিল চাপ, কোভিডের অবসাদ আর সমালোচকদের তীক্ষ্ণ বাণে জর্জরিত সেই নিঝুম রাতেও নিভে যায়নি তাঁর ভেতরের আগুন।
২০২২ সালের এশিয়া কাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করে সেই দীর্ঘ খরা কাটানোর পর শুরু হয় তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সোনালী অধ্যায়। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে নিজের চেনা রূপরসে সমগ্র টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক হয়ে ফাইনালে দলকে অপরাজিত নিয়ে গেলেও শিরোপার আক্ষেপ থেকে যায়।
তবে সেই আক্ষেপ ঘুচে যায় ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে অনবদ্য ৭৬ রানের ইনিংস খেলে পরম আরাধ্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পর তিনি আন্তর্জাতিক এই ফরম্যাট থেকে বিদায় নেন। এরপর ২০২৫ সালে এসে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরা এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর (আরসিবি) জার্সিতে অবিশ্বাস্য পারফর্ম করে টানা দুই শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়ে ক্যারিয়ারের ষোলকলা পূর্ণ করেন চিকু।

বাইশ গজের পিচ একদিন মিলিয়ে যাবে, গ্যালারির কোলাহলও একদিন স্তিমিত হয়ে আসবে সময়ের স্রোতে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা সাক্ষী থাকবে – এক আদিম জেদ আর না হারার মন্ত্রে বুক বেঁধে মাঠে নামা সেই ছেলেটি কেবল কিছু রান বা রেকর্ড কুড়াতে আসেনি। সে এসেছিল রক্তে আগুন জ্বালানো এক শিল্পকর্মের জন্ম দিতে, যা শেষ বিন্দু পর্যন্ত কেবলই জেতার গল্প বলে যায়।











