ফিয়ারলেস ফ্রেডো

ফ্রেডো ১৯৭১ থেকে ১৯৭৩ – এই তিন বছর ছিলেন গ্ল্যামারগনে। এই সময়ে তার সাথে ওপেন করতেন অ্যালান জোন্স। দু’জনের বোঝাপড়া বাড়াতে তাঁদের এক ঘরে থাকার বন্দোবস্তও হয়েছিল। তখনই ঘটে বিপত্তি। ফ্রেডরিকসের বিচিত্র গানের পছন্দে ক্ষেপে গিয়েছিলেন জোন্স। যদিও, সোয়ানসির মাটিতে দারুণ একদিনে এই জুটি নর্দাম্পটনশায়ারের বিপক্ষে ৩৩০ রানের জুটি গড়েন!

সেটা ২8 ডিসেম্বর, ১৯৭৪ সালের কথা। ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট চলছে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে। তখন দ্বিতীয় দিন।

আগের দিন বিশ্বনাথের ৫২, মদন লালের ৪৮, মনসুর আলী খান পতৌদির ৩৬, আর অংশুমানের ৩৬ রানের সৌজন্যে স্বাগতিক ভারত পৌঁছেছিল ২৩৩ রানে। ক্যারিবিয়ান দানবীয় পেসার অ্যান্ডি রবার্টসের বিধ্বংসী ৫০/৫ সত্ত্বেও। তারপর দিনের শেষে ২ ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ১৪/০র মধ্যে ছবির এই ভদ্রলোকের ছিল ১১ রান।

দ্বিতীয় দিনে তিনি একাই বালির বাঁধ হয়ে দাঁড়ান মদনলাল-ঘাউড়ি-বেদী-চন্দ্রশেখরের অসামান্য বোলিংয়ের সামনে। ১৩ টি চার মেরে সংযমী ও বেশ হিসেবী ১০০ রান করে আউট হন দলের ১৮৯ রানের মাথায়। পঞ্চম ব্যাটসম্যান হিসেবে ফেরেন তিনি সাজঘরে।

তারপর মাত্র ৫১ রানে বাকি ৫ উইকেট হারিয়ে ২৪০ রানে শেষ হয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের। প্রথম ইনিংসে টেনেটুনে লিড পায় সাত রানের। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে বিশ্বনাথ-ইঞ্জিনিয়ার-ঘাউড়ির ব্যাট হাতে লড়াই আর বিষান সিং বেদি-ভগবৎ চন্দ্র শেখরের ঘূর্ণি বলে ৮৫ রানে টেস্টটা জিতে গিয়েছিল ভারত। সেটা অবশ্য অন্য গল্প।

এই টেস্টের ছয় বছর আগে এই ওপেনিং ব্যাটসম্যানের টেস্ট অভিষেক হয়েছিল ১৯৬৮ সালে। নাম রয় ফ্রেডরিকস, লোকেরা ডাকতো ‘ফিয়ারলেস ফ্রেডো’ নামে। জন্ম ১৯৪২ সালের ১১ নভেম্বর, গায়ানার বার্বিসে। আসলে ক্যারিবিয়ান ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই বাঁ-হাতি হার্ড-হিটিং ব্যাটসম্যানের ডাক নামের তাঁর কোনো শেষ নেই। কেউ ডাকতো ‘ওল্ড চ্যাপ’ নামে, কেউ বা বলতো ‘কমরেড’।

নয় বছরে খেলেন ৫৯ টেস্ট। তাতে আটটি সেঞ্চুরিসহ ৪৩৩৪ রান (সর্বোচ্চ ১৬৯ রানের ইনিংস) আর সতিটি উইকেট নিয়ে শেষ হয়ে গিয়েছিল তার টেস্ট জীবন, ১৯৭৭ সালে। টেস্টে ৪২.৪৯ গড়ের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ছিল তার ৯৯.৭৭ রানের স্ট্রাইকরেট। তাঁকে ফিয়ারলেস কেন বলা হয় – সেটা নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে।

১২ টি ওয়ানডে খেলে গেছেন তিনি। সেটা ১৯৭৩ সালে শুরু করে ১৯৭৭-এর মধ্যে। ৪ বছরের ওয়ানডে ক্যরিয়ারে আর তার সংগ্রহে ছিল এক সেঞ্চুরিসহ ৩১১ রান (সর্বোচ্চ ১০৫) আর দু’টি উইকেট।

চার বছর খেলে প্রথম টেস্ট শতক পাওয়া, গ্ল্যামারগনের হয়ে তখন রেকর্ড পার্টনারশিপ গড়া, ১৯৭৫ বিশ্বকাপে লিলিকে ছক্কা হাঁকিয়েও ফলোথ্রুতে হিটউইকেট হওয়া, ১৯৭৫ সালে দ্রুতগতির পার্থ পিচে লিলি-থমসনের বিরুদ্ধে জুলিয়েনকে নিয়ে ইনিংস শুরু করে জীবনের সর্বোচ্চ ঐতিহাসিক ১৬৯ রান করা, নির্ভয় ও নিরন্তর ব্যাটিং প্রেমের জন্য ‘কিড সিমেন্ট’ নাম অর্জন – এই সবকিছু তাঁর ক্যারিয়ারের হাইলাইটস।

তাঁকে ব্যাখ্যা করার জন্য আরেকটা ব্যাপার না বললেই নয়। স্বয়ং ব্রায়ান চার্লস লারা তাঁকে আদর্শ মানতেন। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ আগেই তিনি গায়ানার যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্বও পেয়েছিলেন। কোচিংও করেছেন। যদিও, জীবনটা লম্বা হয়নি তাঁর।

ক্রিকেটের ইতিহাসে হেলমেট চলে আসার পরও অনেকদিন ধরে তিনি হেলমেট ছাড়া খেলে গেছেন। অথচ, ক্যান্সারের কাছে হেরে মাত্র ৫৮ বছর বয়সেই ২০০০ সালে মারা যান তিনি। তবে, তিনি নিজের অর্জন দিয়ে অমর হয়ে আছেন ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটে।

মজার একটা তথ্য দিয়ে শেষ করি। ফ্রেডো ১৯৭১ থেকে ১৯৭৩ – এই তিন বছর ছিলেন গ্ল্যামারগনে। এই সময়ে তার সাথে ওপেন করতেন অ্যালান জোন্স। দু’জনের বোঝাপড়া বাড়াতে তাঁদের এক ঘরে থাকার বন্দোবস্তও হয়েছিল। তখনই ঘটে বিপত্তি। ফ্রেডরিকসের বিচিত্র গানের পছন্দে ক্ষেপে গিয়েছিলেন জোন্স।

যদিও, সোয়ানসির মাটিতে দারুণ একদিনে এই জুটি নর্দাম্পটনশায়ারের বিপক্ষে ৩৩০ রানের জুটি গড়েন!

 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...