সন্তানের মহাকাব্যে ক্যানসারজয়ী মায়ের চোখের জল

মাঠে মায়ের নামের আলো ছড়িয়ে মিলারের ব্যাট থেকে আসা এই ১৪২ রান কেবল একটা ম্যাচ জেতানো ইনিংস ছিল না। এটা ছিল জীবনসংগ্রামে জয়ী এক মায়ের জন্য এক সন্তানের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা আর সম্মানের উপহার।

জোহানেসবার্গের ওয়ান্ডারার্সে রবিবার বিকেলটা স্তন ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা অদম্য নারীদের সম্মান জানাতে দক্ষিণ আফ্রিকা দল  মাঠে নেমেছিল গোলাপি জার্সি পরে, কিন্তু এই জার্সিটা মিলারের কাছে ছিল অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা। কারণ তাঁর গায়ে থাকা জার্সিতে শোভা পাচ্ছিল নিজের নামের পরিবর্তে তাঁর মা জেনির নাম, যিনি নিজে স্তন ক্যানসারের মতো কঠিন রোগের সঙ্গে লড়াই করে জিতেছেন।

গ্যালারিতে থাকা মা-বাবা দুজনের সামনেই মাঠে নেমেছিলেন ৩৭ বছর বয়সী এই প্রোটিয়া ব্যাটার। মাঠে নামার আগেই যেন পণ করেছিলেন আজ নিজের সব অভিজ্ঞতা দিয়ে খেলবেন তিনি,  ব্যাটের প্রতিটা শটে যেন মিশে গিয়েছিল বুকের ভেতরের সবটুকু আবেগ আর জেদ। অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের ওপর তোপ দেখিয়ে  মাত্র ৯৩ বলে ১২টি চার আর ৯টি ছক্কায় খেলে ফেললেন ক্যারিয়ারসেরা ১৪২ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস। অন্য প্রান্তে টেম্বা বাভুমার ১০৩ রানের সঙ্গে মিলারের এই মহাকাব্যিক সেঞ্চুরি মিলিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ দাঁড়াল ৩৬৫ রান। ম্যাচ শেষে জয়ের আনন্দের সঙ্গে প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ-এর পুরস্কারও উঠল মিলারের হাতেই।

কিন্তু মাঠের জাদুকরী ব্যাটিংয়ের চেয়েও বড় একটা গল্প তৈরি হয়েছিল গ্যালারিতে। মিলারের প্রতিটি বাউন্ডারিতে যাঁর চোখ ভেসে যাচ্ছিল অশ্রুতে, তিনি আর কেউ নন, তাঁর মা জেনি। সংবাদ সম্মেলনে এসে মিলার নিজেই শোনালেন সেই আবেগের গল্প। তিনি বললেন, “আজকের দিনটা ভীষণ আবেগের ছিল। আমার মনে হয় গত ২৪ ঘণ্টা ধরে মা কেঁদেই চলেছে! বাবা-মা গ্যালারিতে বসে খেলা দেখছেন, আর সেই দিনে মায়ের নামের জার্সি পরে ম্যাচসেরা হওয়া, এর চেয়ে বিশেষ অনুভূতি আর হতে পারে না।”

মায়ের চোখের পানি আর ধুয়ে যাওয়া মেকআপের কথা বলতে গিয়ে হেসেই ফেললেন মিলার। তিনি যোগ করেন “খেলা শেষে মা আমাকে বলছিল, ‘আজ কেঁদে কেঁদে সব মেকআপ ধুয়ে যাচ্ছে, যথেষ্ট মেকআপও নেই আমার কাছে!’ মা-বাবা দুজনেই অনেক কিছুর ভেতর দিয়ে গেছেন। আজকের এই উদযাপন তাঁদের সেই কষ্টের দিনগুলোতে একটু হলেও স্বস্তি দিয়েছে।”

মিলার এখন দক্ষিণ আফ্রিকা দলের সবচেয়ে সিনিয়র সদস্য। আগামী বছর ঘরের মাঠে ওয়ানডে বিশ্বকাপ, কিন্তু  ম্যাথিউ ব্রিজকি আর ডেওয়াল্ড ব্রেভিসের মতো তরুণ তুর্কিদের ভিড়ে দলে জায়গা পাকা করার লড়াইটা তাঁর জন্য বেশ কঠিন। তার উপর তিনি এখন জাতীয় দলের কেন্দ্রীয় চুক্তির বাইরে। তবে এই এক সেঞ্চুরিতে মিলার আবারও জানিয়ে দিলেন, অভিজ্ঞতার ধার এখনো একটুও কমেনি।

মাঠে মায়ের নামের আলো ছড়িয়ে মিলারের ব্যাট থেকে আসা এই ১৪২ রান কেবল একটা ম্যাচ জেতানো ইনিংস ছিল না। এটা ছিল জীবনসংগ্রামে জয়ী এক মায়ের জন্য এক সন্তানের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা আর সম্মানের উপহার।

লেখক পরিচিতি

আমজাদ হোসেন আবির

সাব এডিটর

Share via
Copy link