অবমূল্যায়িত এক মহাতারকার গল্প

তিনি যে ভয়, যে রোমাঞ্চ, যে বিস্ফোরণ আর যে স্মৃতি ক্রিকেটকে উপহার দিয়ে গেছেন, তার বিকল্প আজও তৈরি হয়নি। ক্রিকেটে অনেক দ্রুতগতির বোলার এসেছে, কিন্তু শোয়েব আখতারের মতো একজন ‘রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস’ এখনও আসেনি।

সংখ্যা নয় বরং বিতর্ক দিয়েই শোয়েব আখতারের ক্যারিয়ারকে বেশিরভাগ সময় বিচার করা হয়। ডোপিং বিতর্ক, নিষেধাজ্ঞা, বোর্ডের সঙ্গে সংঘাত, চোট, আদালতের লড়াই, সতীর্থকে মারধরের অভিযোগ—সব মিলিয়ে তার ক্যারিয়ার যেন একের পর এক ঝড়ের গল্প।

শোয়েব আখতার মানেই অপচয় হয়ে যাওয়া এক অসাধারণ প্রতিভা। যেন তিনি সেই ক্রিকেটার, যাকে নিয়ে সবাই শেষ বেলায় এসে বলেছেন, তাঁর আরও অনেক কিছুই দেওয়ার ছিল। কিন্তু সত্যিই কি তাই? সব বিতর্ককে পাশে সরিয়ে শুধু ক্রিকেটার শোয়েব আখতারকে দেখা যায়, তাহলে হয়তো বোঝা যাবে, ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে অবমূল্যায়িত ফাস্ট বোলারদের একজন ছিলেন তিনি।

শোয়েবের সবচেয়ে বড় পরিচয় অবশ্যই তাঁর গতি। কিন্তু তাঁকে শুধু দ্রুততম বোলার বললে তার প্রতি অবিচার করা হবে। কারণ ১৬১.৩ কিলোমিটার গতির সেই বলই তাকে কিংবদন্তি বানায়নি, কিংবদন্তি বানিয়েছিল সেই গতিকে ব্যাটসম্যানের বিরুদ্ধে অস্ত্রে পরিণত করার ক্ষমতা।

এমন এক সময়ে তার আবির্ভাব, যখন টেলিভিশনে প্রথমবারের মতো নিয়মিতভাবে বোলিংয়ের গতি দেখানো শুরু হয়েছিল। পুরো পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে দেখেছে, একজন মানুষ কিভাবে ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে বল ছুড়তে পারেন।

একই সময়ে ছিলেন ব্রেট লি। দুজনকে নিয়ে শুরু হয়েছিল এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা—কে পৃথিবীর দ্রুততম বোলার? দর্শকরা মুগ্ধ হয়েছিল, ক্রিকেট পেয়েছিল এক নতুন উত্তেজনা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটা বড় সত্য স্পষ্ট হয়েছে। ব্রেট লি ছিলেন দুর্দান্ত দ্রুতগতির একজন বোলার। শোয়েব আখতার ছিলেন সেই গতি দিয়ে ব্যাটসম্যানের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়ার শিল্পী। দুজনের মধ্যে পার্থক্যটা এখানেই।

শোয়েবের সেরা স্পেলগুলোর দিকে তাকালেই সেটা বোঝা যায়। কলকাতায় পরপর দুই বলে শচীন টেন্ডুলকার ও রাহুল দ্রাবিড়কে বোল্ড করা, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কয়েক ওভারের ব্যবধানে রিকি পন্টিং, স্টিভ ওয়াহ, মার্ক ওয়াহ ও অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে ফিরিয়ে দেওয়া কিংবা লাহোরে নিউজিল্যান্ডকে মাত্র ৭৩ রানে গুটিয়ে দেওয়া—এসব কেবল উইকেট নয়, এগুলো ছিল ভয় সৃষ্টি করার শিল্প।

পাকিস্তান যেখানে প্রথম ইনিংসে ৬৪৩ রান করেছিল, সেখানে নিউজিল্যান্ডের ইনিংস শেষ হয়েছিল মাত্র ৩০ ওভারেই। শোয়েবের ছয় উইকেটের পাঁচটিই ছিল বোল্ড। প্রায় প্রতিটি বল ছিল ইয়র্কার। কোনো রিভার্স সুইং নয়, কোনো ভয়ংকর টার্ন নয়, শুধু কাঁচা গতি আর নিখুঁত নিশানা। বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদেরও প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় দিতেন না তিনি।

এটাই শোয়েবকে আলাদা করে। কারণ তিনি শুধু গতির ওপর নির্ভর করতেন না। সুইং করাতে পারতেন, সিম মুভমেন্ট বের করতে পারতেন, অ্যাঙ্গেল বদলে ব্যাটসম্যানকে ফাঁদে ফেলতে পারতেন। তার স্লোয়ার বল ছিল সময়ের অনেক এগিয়ে।

স্টক ডেলিভারি আর স্লোয়ার বলের গতির পার্থক্য এত বেশি, অথচ অ্যাকশনে কোনো পরিবর্তন নেই—এমন দক্ষতা খুব কম ফাস্ট বোলারের ছিল। ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লাহোর টেস্টে মাইকেল ভন, ইয়ান বেলদের যেভাবে তিনি বিভ্রান্ত করেছিলেন, সেটা শুধু গতির প্রদর্শনী ছিল না, ছিল বোলিং বুদ্ধিমত্তার এক অসাধারণ উদাহরণ।

অথচ এই মানুষটিই খেলেছেন মাত্র ৪৬টি টেস্ট। সংখ্যাটা অবিশ্বাস্য। পাকিস্তানের আরেক পেসার উমর গুল, যিনি নিজেও সারাজীবন চোটের সঙ্গে লড়েছেন, খেলেছেন ৪৭টি টেস্ট। শোয়েবের ক্যারিয়ারকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তার শরীর।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, এমন কোনো দিন তাঁর মনে পড়ে না, যেদিন হাঁটুতে ব্যথা ছিল না। প্রতিদিন সকালে বিছানা থেকে উঠতেই কষ্ট হতো, বাথরুম পর্যন্ত যেতে হতো প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে। পৃথিবীর দ্রুততম বলগুলো ছোড়ার মূল্য তিনি দিয়েছেন নিজের শরীরকে ধ্বংস করে।

তবু পরিসংখ্যান বলছে, যখনই তিনি ছন্দে ছিলেন, তখন তিনি ছিলেন ওয়ান ম্যান আর্মি। যেসব ইনিংসে তিনি চার বা তার বেশি উইকেট নিয়েছেন, সেখানে পাকিস্তানের অন্য বোলাররা যেখানে একটি উইকেট পেতে গড়ে ৭৫ বল নিয়েছেন, শোয়েব নিয়েছেন মাত্র ২৩ বলে। অর্থাৎ অন্যরা যখন কিছুই করতে পারছিল না, তখনও তিনি নিজের গতিতে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছিলেন। এই ক্ষমতা খুব কম ফাস্ট বোলারের ছিল।

হয়তো তিনি আরও ৪০-৫০টি টেস্ট খেলতে পারতেন। হয়তো তার উইকেটের সংখ্যা ৪০০ কিংবা ৫০০ ছুঁয়ে যেত। হয়তো ইতিহাসের পরিসংখ্যানে তার অবস্থান আরও অনেক উঁচুতে থাকত। কিন্তু, কিংবদন্তি হওয়ার জন্য সব সময় বড় সংখ্যা লাগে না।

তাই তাঁকে শুধু অপচয় হওয়া প্রতিভা বলে বিচার করা অন্যায়। বরং বলা যায়, তিনি ছিলেন ক্রিকেটের সবচেয়ে আন্ডাররেটেড ফাস্ট বোলারদের একজন। তিনি যে ভয়, যে রোমাঞ্চ, যে বিস্ফোরণ আর যে স্মৃতি ক্রিকেটকে উপহার দিয়ে গেছেন, তার বিকল্প আজও তৈরি হয়নি। ক্রিকেটে অনেক দ্রুতগতির বোলার এসেছে, কিন্তু শোয়েব আখতারের মতো একজন ‘রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস’ এখনও আসেনি।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link