ফুটবল বিশ্ব যখন দলগত পারফরম্যান্স ও ব্যক্তিগত দক্ষতার ভারসাম্য খুঁজতে ব্যস্ত, তখন স্পেন জাতীয় দল অবস্থান করছে এক অনন্য উচ্চতায়। টানা ট্রফি জয় কিংবা বড় ম্যাচে একচ্ছত্র আধিপত্য। লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনস্থ এই স্প্যানিশ দলটি বর্তমানে বিশ্বের যেকোনো ফুটবল পরাশক্তির চেয়ে সুস্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে।
অতীতে স্পেনের পরিচিতি ছিল কেবল ‘টিকি-টাকা’ কিংবা পজেশনাল ফুটবলে। তবে বর্তমান লা রোখা দলীয় অবকাঠামোয় যুক্ত করেছে আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে ভয়াবহ সব অস্ত্র। উইংসের বিধ্বংসী গতি, তীব্র প্রেসিং এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা।
অতীতে স্পেনের মূল সমস্যা ছিল মাঝমাঠে বল ধরে রাখলেও ফাইনাল থার্ডে গোল করার লোক খুঁজে না পাওয়া। দে লা ফুয়েন্তে এই ছকে এনেছেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন। স্পেনের প্রধান শক্তি এখন দুই উইং। ডান প্রান্তে লামিনে ইয়ামাল এবং বাম প্রান্তে নিকো উইলিয়ামস। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বিপজ্জনক দুই তরুণ উইঙ্গারকে তারা চমৎকারভাবে ব্যবহার করছে।

মাঝমাঠের সেন্ট্রাল মিডফিল্ডাররা প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে ভেতরের দিকে টেনে নিয়ে সংকুচিত করেন, যার ফলে দুই উইংয়ে সুবিশাল খালি জায়গা তৈরি হয়। এই ফাঁকা জায়গায় ইয়ামাল ও উইলিয়ামস ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষের ফুলব্যাকদের ওপর প্রতিনিয়ত তাণ্ডব চালান।
মাঝমাঠে রড্রি কিংবা জুবিমেন্দির মতো বিশ্বমানের হোল্ডিং মিডফিল্ডাররা রক্ষণের ঢাল হিসেবে কাজ করেন, যা অন্য মিডফিল্ডার ও ফুলব্যাকদের স্বাধীনভাবে ওপরে ওঠার সুযোগ দেয়। একই সাথে পেদ্রি, গাভি বা দানি ওলমোদের মতো প্লেমেকাররা উইঙ্গার ও স্ট্রাইকারের মধ্যবর্তী ‘হাফ-স্পেস’গুলোতে অবস্থান নেন। এর ফলে প্রতিপক্ষের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডাররা কাকে মার্ক করবেন – উইঙ্গার নাকি পকেট স্পেসের মিডফিল্ডারকে, তা নিয়ে প্রতিনিয়ত চরম দ্বিধায় পড়ে যান।
বিশ্বের অন্যান্য শীর্ষদলগুলো যেখানে নির্দিষ্ট এক বা দুজন তারকার ওপর নির্ভর করে বা নির্দিষ্ট একটি কৌশলে আটকে থাকে, সেখানে স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের দুর্দান্ত ট্যাকটিক্যাল নমনীয়তা ও স্কোয়াড ডেপথ। প্রতিপক্ষ যদি অতি রক্ষণে বসে থাকে, স্পেন তখন দূরপাল্লার শট বা উইং থেকে ক্রসিং শুরু করে। আবার প্রতিপক্ষ যদি উন্মুক্ত ফুটবল খেলে, স্পেন তখন তাদের কাউন্টার অ্যাটাকের গতি দিয়ে ধ্বংস করে।

আধুনিক ফুটবল দাঁড়িয়ে আছে গতি, শারীরিক শক্তি ও মেধার সংযোগস্থলে। স্পেন দল তাদের ঐতিহ্যবাহী পজেশন গেমের সাথে আধুনিক গতিময় উইং প্লে এবং কাউন্টার-প্রেসিংয়ের এমন এক ভয়াবহ ককটেল তৈরি করেছে, যার কোনো সমাধান আপাতত প্রতিপক্ষ দলগুলোর কাছে নেই। এই নিখুঁত কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বের কারণেই বর্তমান ফুটবল বিশ্বে যেকোনো প্রতিপক্ষের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে রাজত্ব করছে লা রোখা।











