রস টেলরের মহাকাব্যিক যাত্রা

যার ব্যাটের ডগায় মিশে থাকত কিউই দ্বীপপুঞ্জের নোনা জল আর মাওরি ঐতিহ্যের আদিম তেজ। তাঁর ক্যারিয়ার যেন কোনো ধ্রুপদী মহাকাব্য। যেখানে ট্র্যাজেডি আছে, রাজকীয় প্রত্যাবর্তন আছে, আর আছে শরতের বিকেলের মতো এক শান্ত সমাহিত বিদায়, আবার নতুন রঙে ফিরে আসা।

নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটে রস টেলর মানেই এক অবিচল আস্থার  মহাসমুদ্র, যার ব্যাটের ডগায় মিশে থাকত কিউই দ্বীপপুঞ্জের নোনা জল আর মাওরি ঐতিহ্যের আদিম তেজ। তাঁর ক্যারিয়ার যেন কোনো ধ্রুপদী মহাকাব্য। যেখানে ট্র্যাজেডি আছে, রাজকীয় প্রত্যাবর্তন আছে, আছে শরতের বিকেলের মতো এক শান্ত সমাহিত বিদায়, আবার নতুন রঙে ফিরে আসা।

রস যখন ক্রিজে আসতেন, মাঠের কোলাহল ছাপিয়ে এক গম্ভীর নিস্তব্ধতা নেমে আসত। তাঁর সেই ট্রেডমার্ক ‘জিহ্বা বের করা’ উদযাপন কেবল কোনো ভঙ্গি ছিল না, তা ছিল হাজার বছরের মাওরি হাকা-র এক নীরব প্রতিধ্বনি। যখন তিনি মিড উইকেট দিয়ে চাবুকের মতো তাঁর সেই বিখ্যাত ‘স্লগ সুইপ’ খেলতেন, মনে হতো কোনো দক্ষ ভাস্কর পাথর কেটে নিখুঁত এক শৈল্পিক রূপ দিচ্ছেন। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল না কোনো পেশিবহুল আস্ফালন, বরং ছিল পাহাড়ি ঝরনার মতো এক অদম্য ছন্দ।

টেলরের লড়াকু সত্তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে থাকবে ২০১৮ সালের ডানেডিন। ইংল্যান্ডের বিশাল রান তাড়া করতে গিয়ে যখন তাঁর ঊরুর পেশি ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম, গ্যালারি ভেবেছিল নাটকের বোধহয় যবনিকাপাত ঘটেছে। কিন্তু রস সেদিন মাঠ ছাড়েননি। অসহ্য যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে, এক পায়ে ভর দিয়ে তিনি খেললেন ১৮১* রানের এক অবিনশ্বর ইনিংস। খুড়িয়ে খুড়িয়ে নেওয়া প্রতিটি রান ছিল তাঁর ইচ্ছাশক্তির জয়গান। সেদিন ডানেডিনের ওভাল দেখেছিল, মাওরি যোদ্ধারা ঝড়ের মুখেও শিকড় উপড়াতে দেয় না।

তাঁর ক্যারিয়ারের আকাশ সবসময় মেঘমুক্ত ছিল না। অধিনায়কত্ব হারানোর সেই অপমানের কালবেলা তাকে চুরমার করে দিতে পারত। কিন্তু রস বেছে নিয়েছিলেন হিমালয়সদৃশ নীরবতা। তিনি নিজের উইলোর মাধ্যমেই সমালোচকদের উত্তর দিয়েছেন। পার্থের তপ্ত রোদে ২৯০ রানের সেই মহাকাব্য কিংবা লর্ডসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বিশ্বজয়ের হাসি – সবই ছিল তাঁর ধৈর্যের ফসল।

২০২২ সালে ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি ওভালে যখন গোধূলির আলো ফিকে হয়ে আসছিল, রস টেলরের দুচোখ ভিজে উঠেছিল অশ্রুতে। সেই অশ্রু পরাজয়ের নয়, বরং এক দীর্ঘ ও গৌরবোজ্জ্বল যাত্রার পূর্ণতার। আধুনিক ক্রিকেটের আগ্রাসনের ভিড়ে তিনি ছিলেন এক ঋষিতুল্য ব্যক্তিত্ব, যিনি বিনয় দিয়েই বিশ্বজয় করেছেন।

তবে ক্রিকেট বিধাতা বোধহয় তাঁর গল্পের উপসংহার রচনা করার জন্য তখনও প্রস্তুতই ছিলেন না। নিউজিল্যান্ডের পাঠ চুকিয়ে তিনি ফিরে গেছেন শিকড়ের টানে, তাঁর মায়ের জন্মভূমি সামোয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আঙিনায়। যে ব্যাটে একসময় অস্ট্রেলিয়ার তপ্ত রোদে ২৯০ রানের পাহাড় গড়েছিলেন, সেই ব্যাট হাতেই এখন সামোয়ার হয়ে ক্রিকেট মাতাচ্ছেন ক্রিকেট নাট্যের অনন্য এই চরিত্র।

লেখক পরিচিতি

ক্রীড়াচর্চা হোক কাব্য-কথায়!

Share via
Copy link