ফুটবলের সবুজ গালিচায় অনেকেই শাসন করতে এসেছেন, কিন্তু রাজা হয়ে উঠেছেন খুব কম জনই। দিদিয়ের দ্রগবা ছিলেন সেই বিরল প্রতিভাদের একজন, যাঁর জীবনের গল্প কোনো হলিউড স্ক্রিপ্টের চেয়ে মোটেই কম রোমাঞ্চকর নয়।
১৯৭৮ সালে আবিদজানে যখন তাঁর জন্ম, তখন কে ভেবেছিল এই ছেলেটিই একদিন পুরো জাতির ভার কাঁধে তুলে নেবে! মাত্র পাঁচ বছর বয়সে গলায় স্কার্ফ জড়িয়ে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন ফ্রান্সে। মা-বাবার কাছ থেকে দূরে থাকা সেই ছোট্ট দ্রগবা এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন।
ফুটবলের প্রতি প্রেম ছিল তাঁর রক্তে, কিন্তু তাঁর পেশাদার জীবনের শুরুটা ছিল বড্ড ধীর। যখন সমসাময়িক তারকারা বিশ বছরে বিশ্বজয় করছেন, দ্রগবা তখনো ফ্রান্সের লিগ টু’র অলিগলিতে নিজেকে খুঁজে ফিরছেন।

২০০৪ সালে হোসে মরিনহো যখন তাকে চেলসিতে নিয়ে এলেন, তখন অনেক সমালোচকই ভ্রু কুঁচকেছিলেন। কিন্তু মরিনহো জানতেন, তিনি কোনো সাধারণ স্ট্রাইকার নয়, বরং এনেছেন এক অদম্য গোলাবারুদ।
স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের ঘাসে দ্রগবা ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। তাঁর প্রশস্ত কাঁধ, অনন্য দক্ষতা আর গোল করার অদম্য ক্ষুধা তাকে প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারে পরিণত করে। বড় ম্যাচের নায়ক হিসেবে তাঁর চেয়ে নির্ভরযোগ্য কেউ ছিল না। বিশেষ করে আর্সেনালের রক্ষণভাগের কাছে তিনি ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক।
২০১২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল। বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে যখন চেলসি খাদের কিনারায়, ঘড়ির কাঁটা তখন ৮৮ মিনিটে। ঠিক তখনই সেই বিখ্যাত হেড। বাতাসে ভেসে উঠে দ্রগবার এক মরণকামড়। ম্যাচ গড়াল টাইব্রেকারে। শেষ পেনাল্টি শটটি নিতে যখন তিনি এগিয়ে আসলেন, পুরো ফুটবলবিশ্ব থমকে গিয়েছিল। কিন্তু দ্রগবা যে হতাশ করতে জানেন না!

তবে দ্রগবার জীবনের শ্রেষ্ঠ গোলটি কোনো ফুটবল মাঠে হয়নি, হয়েছিল ২০০৫ সালে একটি ড্রেসিংরুমে। আইভরি কোস্ট যখন গৃহযুদ্ধে রক্তাক্ত, বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার পর দ্রগবা সরাসরি ক্যামেরার সামনে হাঁটু গেড়ে বসেছিলেন। তিনি আকুতি জানিয়েছিলেন, “প্লিজ, অস্ত্র নামিয়ে রাখুন। আমাদের ক্ষমা করে দিন।”
তাঁর সেই একটি বার্তায় দীর্ঘ পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধ থমকে গিয়েছিল। ধ্বংসের দারপ্রান্ত থেকে রক্ষা পেয়েছিল গোটা একটি জাতি। একজন ফুটবলার কীভাবে জাতির বিবেক হয়ে উঠতে পারেন, দ্রগবা তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
দ্রগবা যখন বুটজোড়া তুলে রাখলেন, তখন তাঁর নামের পাশে অসংখ্য ট্রফি আর ব্যক্তিগত অর্জন। কিন্তু পরিসংখ্যান দিয়ে তাকে মাপা অসম্ভব। তিনি ছিলেন গতির সাথে শক্তির, এবং রুক্ষতার সাথে শৈল্পিকতার এক বিরল মিশ্রণ। তিনি শিখিয়েছেন যে, সাফল্য পেতে দেরি হওয়া মানেই হেরে যাওয়া নয়।
আজও যখন আইভরি কোস্টের কোনো শিশু ফুটবল পায়ে মাঠে নামে, সে দ্রগবা হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কারণ দিদিয়ের দ্রগবা মানে কেবল গোল করা নয়, দিদিয়ের দ্রগবা মানে গোটা একটি জাতির স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা।











