সৌম্য ‘গিনিপিগ’ সরকার

সৌম্য সরকার ঠিক তেমনই একজন। কিন্তু তাকে যদি বারবার গিনিপিগ বানানো হয়, তবে সেই সম্ভাবনা একসময় নদীর মতোই হারিয়ে যাবে—বয়ে চলবে, কিন্তু কোনো কূল পাবে না।

মিরপুরের দুপুরটা তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। নিয়মিত দৃশ্য একটা দৃশ্য। ঠিক যেভাবে সৌম্য নিজেকে বারবার নতুন চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত রাখেন, ঠিক তেমন।

সৌম্য সরকার সব সময় তৈরি থাকেন। জাতীয় দলের চলমান ক্যাম্পেও তিনি নিয়মিত মুখ। কারণ, সৌম্য জানেন কারণে বা অকারণে জাতীয় দলে তাঁর ডাক আসবে বারবার। কোচ সোহেল ইসলামের সাথেও তাঁকে আলাদা করে কাজ করতে দেখা গেল।

শেষ দুই ম্যাচে ১৩৬ রান—সংখ্যাটা খুব বড় না মনে হলেও, প্রেক্ষাপটটা ছিল বিশাল। কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ না। আসল গল্পটা শুরু হয় এরপর। মিরপুরের এই কঠিন উইকেটে এমন কৌশলী ক্রিকেট খেলেও পরের সিরিজে ডাগ আউটে বসে থেকেছেন সৌম্য সরকার।

বাংলাদেশ দলে একটা অদ্ভুত সমীকরণ আছে—যখনই কাউকে জায়গা দিতে হবে, কাউকে বাদ দিতেই হবে, তখন প্রথম নামটা চলে আসে সৌম্য সরকার-এর। যেন তিনি একজন ক্রিকেটার নন, বরং একটি ‘অপশন’। যাকে চাইলেই বসানো যায়, আবার চাইলেই ফিরিয়ে আনা যায়।

তার ক্যারিয়ারটা যেন এক চলমান পরীক্ষাগার। কখনো ওপেনার, কখনো তিন নম্বর, কখনো মিডল অর্ডার, আবার কখনো ফিনিশার—একজন ক্রিকেটারের জন্য যতগুলো পরিচয় সম্ভব, তার প্রায় সবগুলোই তিনি বহন করেছেন। কিন্তু এই বহুমুখীতার আড়ালে একটা প্রশ্ন বারবার উঠে আসে—কখনো কি তাকে ঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে?

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজেই যেমন—৯১ আর ৪৫ রানের দুই ইনিংস। পুরো সিরিজে দলের সেরা ব্যাটারদের একজন। অথচ পরের সিরিজেই তিনি নেই। পাকিস্তানের বিপক্ষে একটা ম্যাচেও সুযোগ পাননি।

এটা কি শুধুই দলগত কম্বিনেশন, নাকি অভ্যাসে পরিণত হওয়া অবহেলা? সৌম্য সরকার-এর গল্পটা আসলে সোজা না। তিনি সেই ক্রিকেটার, যাকে এক লাইনে ব্যাখ্যা করা যায় না। অনেকদিন রান পাবেন না, সমালোচনায় ডুবে থাকবেন—তারপর হঠাৎ একদিন এমন এক ইনিংস খেলবেন, যা সব হিসাব উল্টে দেবে।

ধারাবাহিকতা—এই শব্দটাই তার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে। কখনো ধারাবাহিক রান নেই, কখনো আবার ধারাবাহিক ব্যর্থতা। কিন্তু এই ওঠানামার মাঝেও একটা জিনিস কখনো হারায়নি—তার ভেতরের সম্ভাবনা।

পরিসংখ্যানও সেই কথাই বলে। বাংলাদেশের হয়ে দ্রুততম দুই হাজার রান করার রেকর্ড এখনো তার দখলে। তালিকার পরের নাম লিটন দাস। এটা শুধু একটা রেকর্ড না, এটা তার সামর্থ্যের প্রমাণ।

তবুও তাকে নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটে না। কারণ আধুনিক ক্রিকেটে সৌম্য সরকার এক ধরনের ‘বাজি’। তিনি নিরাপদ নন, কিন্তু সম্ভাবনাময়। তিনি ধারাবাহিক নন, কিন্তু ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারেন।

প্রশ্নটা তাই সহজ—বাংলাদেশ কি সেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত? কারণ বড় দলগুলো শুধু নিরাপদ খেলোয়াড় দিয়ে তৈরি হয় না। সেখানে লাগে কিছু অপ্রত্যাশিত, কিছু অগোছালো প্রতিভা—যারা ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে।

সৌম্য সরকার ঠিক তেমনই একজন। কিন্তু তাকে যদি বারবার গিনিপিগ বানানো হয়, তবে সেই সম্ভাবনা একসময় নদীর মতোই হারিয়ে যাবে—বয়ে চলবে, কিন্তু কোনো কূল পাবে না।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link