ফুটবলে ‘লোনে’ খেলার প্রচলন হলো যেভাবে

জমানা বদলেছে। এক সময়ের অনিয়মিত ‘লোন’-এর সংস্কৃতি আধুনিক ক্লাব ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েছে। খেলোয়াড়রা এখন দেশ আর ক্লাবের গণ্ডি পেরিয়ে নিজেদের বিকশিত করে ছড়াচ্ছেন ফুটবলের সার্বজনীন বার্তা।

১৮৭২ সালের এফএ কাপ ফাইনাল। রয়্যাল ইঞ্জিনিয়ার্সের বিপক্ষে গোল করলেন ওয়ান্ডারার্সের এ. এইচ. চেকার নামের এক অপরিচিত খেলোয়াড়। চেকারের আসল নাম মরটন বেটস। তার দল হ্যারো চেকার্স টুর্নামেন্টটি থেকে ছিটকে যাওয়ায় ছদ্মনামে তিনি লোনে খেলেছিলেন ওয়ান্ডারার্সের হয়ে। আর এভাবেই ফুটবলে প্রচলন হয় খেলোয়াড়দের ‘ধার’ বা লোনে খেলানোর সংস্কৃতির।

শুরুর দিকে ফুটবলে লোন ছিল মূলত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশল। দীর্ঘ ভ্রমণ বা হঠাৎ ইনজুরিতে খেলোয়াড় সংকট দেখা দিলে, সফরকারী দলগুলো স্বাগতিকদের থেকেই সদস্য ধার করত। তবে ফুটবল পেশাদার রূপ নেওয়ার পর এই প্রথা নিয়ে বিতর্কের জন্ম হয়। বিশেষ করে ছদ্মানামের ব্যবহার এবং অন্য দলের সেরা খেলোয়াড়দের লোনে এনে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে খেলানোর প্রবণতা প্রক্রিয়াটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে।

১৮৮৫ সালে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্স এই কাজটিই করে। তারা এফএ কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েস্ট ব্রমউইচের বিপক্ষে গ্রেট লেভারের ক্যাপ্টেন টট রসট্রন, প্রিস্টন ফরোয়ার্ড ফ্রেড ডিউহার্স্ট ও অ্যাক্রিংটনের ফুটবলার জর্জ হাওয়ার্থের মতো তারকাদের লোনে এনে জেতার চেষ্টা করে। বাধ্য হয়ে খোদ ইংলিশ ফুটবল ফেডারেশন হস্তক্ষেপ করে।

তবে লোন ডিল অনন্য রূপ পায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে। সেসময়ে তৈরি হয় ‘গেস্ট প্লেয়ার’ সিস্টেম। অনেক ফুটবলার যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ায় ক্লাবগুলো তখন চরম খেলোয়াড় সংকটে পড়ে। ফলে ম্যাচভিত্তিক চুক্তিতে অতিথি হিসেবে অন্য ক্লাবের খেলোয়াড়দের দলে নিয়ে খেলতে শুরু করে দলগুলো।

এমনকি তারকারা সকালে এক ক্লাবে খেলে বিকেলে নামতেন অন্য ক্লাবের হয়ে। ১৯৪০ সালের ক্রিসমাসে প্রখ্যাত ইংলিশ জাতীয় দলের ফুটবলার লেন শ্যাকলটন সকালে ব্রেডফোর্ড পার্কের হয়ে মাঠ কাঁপিয়ে বিকালে ব্রেডফোর্ড সিটির হয়ে খেলেন এবং দুই ম্যাচেই গোল করেন। আর স্ট্যানলি ম্যাথিউস তো গড়েন আরেক কীর্তি। প্রথম কোনো খেলোয়াড় হিসেবে তিনি অতিথি কোটায় যুদ্ধকালীন আন্তর্জাতিক ম্যাচে স্কটল্যান্ডের হয়ে মাঠে নামেন।

১৯৬৬ সালে লোন ব্যবস্থাকে একটি সুশৃঙ্খল আইনি কাঠামো দেয় ইংলিশ লিগ কর্তৃপক্ষ। তখন থেকেই নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং বেশকিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় লোনে খেলোয়াড়দের খেলানোর জন্য। ক্লাবগুলো শুধু নির্দিষ্ট ডিভিশনের লিগের ভেতর শুধু খেলোয়াড়দের লোনে এনে খেলাতে পারতো তখন।

কিন্তু জমানা বদলেছে। লোনের নীতিমালা এবং পদ্ধতিও আরও পেশাদার ও পরিণত হয়েছে। এক সময়ের সেই অনিয়মিত ‘লোন’-এর সংস্কৃতি আধুনিক ক্লাব ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েছে। খেলোয়াড়রা এখন দেশ আর ক্লাবের গণ্ডি পেরিয়ে নিজেদের বিকশিত করছেন এবং ছড়াচ্ছেন ফুটবলের সার্বজনীন বার্তা।

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link