গতি, নান্দনিকতা ও এক অমর রাজত্বের গল্প

প্যারিসের লেস উলিসের আলো-আঁধারি গলি থেকে হাইবেরির রেশমি ঘাস - থিয়েরি অঁরির জীবনকাহিনি কেবল কিছু ট্রফি বা পরিসংখ্যানের খতিয়ান নয়, এটি ছিল ফুটবলের ব্যাকরণকে নতুন করে লেখার এক মহাকাব্যিক রেনেসাঁ।

প্যারিসের লেস উলিসের আলো-আঁধারি গলি থেকে হাইবেরির রেশমি ঘাস – থিয়েরি অঁরির জীবনকাহিনি কেবল কিছু ট্রফি বা পরিসংখ্যানের খতিয়ান নয়, এটি ছিল ফুটবলের ব্যাকরণকে নতুন করে লেখার এক মহাকাব্যিক রেনেসাঁ।

১৯৭৭ সালের ১৭ আগস্ট প্যারিসের উপকণ্ঠে জন্ম অঁরির। বাবা অঁতোয়ান সবসময় চাইতেন ছেলে বড় অ্যাথলেট হোক, আর মা মেরি জোর দিতেন পড়াশোনায়। তবে অঁরির ধ্যানজ্ঞান ছিল কেবল ফুটবল।

লেস উলিসের কংক্রিটের উঠোনে বড়দের সঙ্গে খেলা সেই ছোট ছেলেটির গতি আর নিখুঁত ফিনিশিং খুব অল্প বয়সেই স্থানীয় স্কাউটদের নজর কাড়ে। ১৩ বছর বয়সে ফ্রান্সের বিখ্যাত ক্লেয়ারফন্তেইন একাডেমিতে তাঁর প্রবেশ ঘটে, যা তাঁর জীবনের প্রথম বড় বাঁক।

ক্লেয়ারফন্তেইনে থাকা অবস্থাতেই আর্সেন ওয়েঙ্গারের চোখে পড়েন অঁরি। ১৯৯৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে মোনাকোর হয়ে পেশাদার ফুটবলে অঁরির অভিষেক হয়। মূলত লেফট উইঙ্গার হিসেবে খেলানো হতো তাকে।

১৯৯৬-৯৭ মৌসুমে মোনাকোকে লিগ ওয়ানের শিরোপা জেতাতে ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের হয়ে নিজ দেশে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পান এই তরুণ, দলের সর্বোচ্চ গোলদাতাও ছিলেন তিনিই।

​১৯৯৯ সালে ইতালির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব জুভেন্টাসে যোগ দেওয়াটা ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময়। ইতালীয় ফুটবলের অতি-রক্ষণাত্মক কৌশল এবং উইং-ব্যাক হিসেবে শারীরিক খাটাখাটুনির মধ্যে অঁরি যেন নিজের মৌলিক অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছিলেন।

১৯৯৯ সালে অঁরিকে লন্ডনে নিয়ে আসেন তাঁর পুরোনো গুরু আর্সেন ওয়েঙ্গার। ওয়েঙ্গার এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন – উইঙ্গার অঁরিকে বানিয়ে দিলেন দলের মূল সেন্ট্রাল স্ট্রাইকার। প্রথম আট ম্যাচে কোনো গোল পাননি অঁরি, সমালোচনা ছড়ালো চারিদিকে। কিন্তু একবার যখন তিনি ছন্দে ফিরলেন, ফুটবলের ইতিহাস চিরতরে বদলে গেল।

​আর্সেনালের হাইবেরি স্টেডিয়াম হয়ে উঠল অঁরির নিজস্ব সাম্রাজ্য। তাঁর খেলার স্টাইল স্ট্রাইকারদের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিয়েছিল। তিনি কেবল বক্সে ওত পেতে থাকা গোলদাতা ছিলেন না। তিনি নিচে নেমে আসতেন, বাঁ দিকে ছিটকে যেতেন, ড্রিবল করে প্রতিপক্ষের মাঝমাঠ ধ্বংস করে দিতেন।

​২০০১-০২ মৌসুমে জোড়া শিরোপা জয়ের পর আসে ফুটবলের সেই ঐতিহাসিক ২০০৩-০৪ মৌসুম। আর্সেনাল পুরো লিগ মৌসুমে একটি ম্যাচও না হেরে ‘ইনভিন্সিবলস’ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। সেই মৌসুমে অঁরি একাই করেন ৩০টি গোল। আর্সেনালের হয়ে ২৫৮টি গোল করে ক্লাবের সর্বকালের সেরা গোলদাতা হন তিনি, জয় করেন চারটি প্রিমিয়ার লিগ গোল্ডেন বুট।

২০০৭ সালে তিনি যোগ দেন বার্সেলোনায়। সেখানে পেপ গার্দিওলার অধীনে মেসি এবং সামুয়েল এতোর সাথে গড়ে তোলেন এক বিধ্বংসী আক্রমণভাগ। ২০০৮-০৯ মৌসুমে বার্সেলোনা একসাথে ছয়টি ট্রফি জেতে, যার মধ্যে ছিল অঁরির বহু প্রতীক্ষিত চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা।

​২০১৪ সালে ফুটবলকে বিদায় জানান এই কিংবদন্তি। বর্তমানে কোচিং ও ধারাভাষ্যের জগতে থাকলেও থিয়েরি অঁরি মানেই এক যুগান্তকারী অধ্যায়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, গোল করাটা কেবল বল জালে পাঠানো নয়, তা হতে পারে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নান্দনিক শিল্প।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

ত্রিদেশীয় সিরিজে তুরুপের তাস কারা?

দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশের ওয়ানডে দলে হাসান মাহমুদের প্রত্যাবর্তন, তবে টেস্ট ক্রিকেটে নিয়মিত পারফরম্যান্সে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়ে চলেছেন হাসান! লাল বলের ক্রিকেটে তাঁর বোলিংয়ের ধার এবার সাদা বলেও দেখতে চাইবে লাল-সবুজের পতাকাবাহীরা। গতি, নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ আর ব্যাটারকে ভুল করতে বাধ্য করার দক্ষতা তাঁকে করে তুলতে পারে পেস আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। নতুন বলে উইকেট তুলে নেওয়া থেকে শুরু করে মাঝের ওভারে রান আটকে রাখা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা হতে পারে তাৎপর্যপূর্ণ। টেস্টের আত্মবিশ্বাস ওয়ানডেতেও অনূদিত হলে হাসানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের বোলিংয়ে যোগ করতে পারে বাড়তি ধার। তবে একাদশে সরাসরি জায়গা পাবেন কি না, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়ের জায়গা।

শিরোপার উল্লাসে লেখা হবে জামালের বিদায়গাথা?

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জন্ম নেওয়া জামালের ফুটবলের হাতেখড়ি ইউরোপের যুব ফুটবল কাঠামোয়। ব্রন্ডবি আইএফের যুব দল পেরিয়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে সুযোগ পান এফসি কোপেনহেগেনের যুব দলে। সামনে ছিল পেশাদার ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু ২০০৬ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে, গ্যাং-সংক্রান্ত গোলাগুলির মধ্যে পড়ে তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয় চারটি বুলেট। কয়েক দিন কোমায় থাকার পর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। একটা সময় আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, হয়তো আর কখনো ফুটবলে ফেরা হবে না তাঁর। কিন্তু জামাল ফিরলেন, হয়ে রইলেন বাংলাদেশ ফুটবলের এক জীবন্ত কিংবদন্তী!

Share via
Copy link