ক্রিকেটের অমোঘ মহাকাব্য

ক্রীড়ামোদীদের কাছে ধোনি শুধু একজন ক্রিকেটার নন, তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের এক অনন্য রূপকার। যাঁর অনবদ্য নেতৃত্ব, কার্যকর ব্যাটিং নৈপুণ্য আর ধীরস্বভাবের জাদুতে ক্রিকেটের ইতিহাসে রচিত হয়েছে এক অমোঘ মহাকাব্য!

ঝাড়খণ্ডের অপরিচিত গলি থেকে ক্রিকেট মাঠে পা রাখলেন এক দীর্ঘকেশী যুবক। ব্যাটিংয়ে প্রথাবিরুদ্ধ স্বভাব, চোখে অদম্য স্বপ্নের ঝিলিক, আর বুকে ইতিহাস বদলে দেওয়ার প্রত্যয়! নামটা মাহেন্দ্র সিং ধোনি। যাঁর হাত ধরে ভারতীয় ক্রিকেট উঠেছে অলিম্পাসের চূড়ায়।

ধোনি প্রথম আলোচনায় আসেন ২৩ বছর বয়সে ভারত এ দলের হয়ে কেনিয়ায় অনুষ্ঠিত এক ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ খেলে। টুর্নামেন্টটিতে দুটি সেঞ্চুরি করে ভারতীয় নির্বাচকদের নজরে আসেন ১৯৮১ সালে জন্মানো এই ডানহাতি উইকেটকিপার-ব্যাটার।

পরের বছর ভারতের জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে তাঁর। সুযোগ পাওয়ার এক বছরের ভেতরেই ১৪৮ ও ১৮৩ রানের দুটি ক্যামিও ইনিংস খেলে নিজের সামর্থ্যের জানান দেন তিনি। তাঁর সিগনেচার হেলিকপ্টার শটের বন্যা কিংবা দলের প্রয়োজনে জ্বলে ওঠার অভ্যাসের কারণে প্রতিপক্ষরা তাঁকে সমীহ করতে শুরু করে।

ভারতের ক্যাপ্টেন রাহুল দ্রাবিড়ের অবসরের পর দলের নেতৃত্বের ভার বর্তায় ধোনির ওপর। এরপরই তিনি দেখান আসল জাদু! ২০০৭-এর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তারুণ্যনির্ভর ভারত শিরোপা জিতে নিয়ে সোনালী অধ্যায়ের সূচনা ঘটায় তাঁর অধিনায়কত্বে।

এরই ধারাবাহিকতায়, ২০১১-এর ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে তাঁর ঐতিহাসিক ফিনিশিংয়ে ২৮ বছরের আক্ষেপ মিটিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। ভারতকে প্রথমবার টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে নিয়ে যেতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন দেশটির হয়ে সব ফরম্যাট মিলিয়ে রেকর্ড ৩৩২ ম্যাচে অধিনায়কত্ব করা এই তারকা।

ধোনির আসল শক্তি ছিল তাঁর ইস্পাতকঠিন মানসিকতা। খাদের কিনারা থেকেও তিনি ম্যাচ বের করে আনার টোটকা জানতেন। মাঠের পরিস্থিতি বুঝে কখনো ধৈর্যের সঙ্গে ব্যাটিং করে যাওয়া, আবার কখনো মারদাঙ্গা স্টাইলে বড় বড় ছক্কা হাঁকানো কিংবা ডেথ ওভারে সঠিক বোলারের হাতে বল তুলে দেওয়া—সবকিছুতেই সমান পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি।

উইকেটের পেছনেও ধোনির ক্ষিপ্রতা ছিল চোখে পড়ার মতো। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর চার হাজার ৮৭৬ রানের সাথে ২৯৪ ডিসমিসালের পরিসংখ্যান সেটিরই প্রমাণ। আর ওয়ানডেতে তাঁর রান সংখ্যা ছিল অযুতের ঘরে, ডিসমিসাল ৪৪৪টি!

তবে ক্যারিয়ারে চড়াই-উতরাই সবারই থাকে, ধোনিরও ছিল। ২০১১ বিশ্বকাপের পর বিদেশের মাটিতে টানা আটটি টেস্ট হারের পর তাঁর টেস্ট নেতৃত্ব বেশ প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। ঘরের মাঠে ২০১২-১৩ মৌসুমে ইংল্যান্ডের কাছেও টেস্ট সিরিজ খুইয়ে সেই প্রশ্নের আগুনে বাড়তি ঘি যোগ হয়! এরপরও সব সমালোচনা শান্তমুখে সামলানোর চেষ্টা করেছেন ‘ক্যাপ্টেন কুল’।

২০১৩ সালেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে তিনি ২২৪ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলে সকল সমালোচনার মোক্ষম জবাব দেন। ভারতও পায় জয়। কিন্তু এরপর ফের দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজ জিততে না পারায় কিছুটা আক্ষেপ জমা হয় ধোনির টেস্ট ক্যারিয়ারে। ক্রিকেটের দীর্ঘ সংস্করণটিতে ছয়টি সেঞ্চুরি ও ৩৩টি হাফ সেঞ্চুরির মালিক এই ক্রিকেটার ২০১৭ সালের অস্ট্রেলিয়া সফর শেষে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেন।

তবে ওয়ানডেতে তিনি ছিলেন সবসময়ের মতোই স্বত:স্ফূর্ত। ২০১৫ ও ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে দলকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ২০১৯ বিশ্বকাপের সেমিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা ম্যাচটিই ম্যান ইন ব্লুজদের হয়ে ধোনির শেষ ম্যাচ হয়ে আছে। ম্যাচটির বছরখানেক পর করোনা মহামারীর সময় ২০২০ সালের ১৫ আগস্ট আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান এই কিংবদন্তি।

ক্রীড়ামোদীদের কাছে ধোনি শুধু একজন ক্রিকেটার নন, তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের এক অনন্য রূপকার। যাঁর অনবদ্য নেতৃত্ব, কার্যকর ব্যাটিং নৈপুণ্য আর ধীরস্বভাবের জাদুতে ক্রিকেটের ইতিহাসে রচিত হয়েছে এক অমোঘ মহাকাব্য!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link