ব্যাটারের চোখের পলক পড়ার আগেই যে গতি আর নিপুণতা স্টাম্পের বেল উড়িয়ে দেয়, তাঁর নাম মোহাম্মদ শামি। বাতাসে ভাসতে থাকা লাল কিংবা সাদা বলটা যখন খাড়া সিমে চকচক করে ওঠে, তখন ব্যাটাররা নিশ্চিত জেনে যান সামনে কোনো সাধারণ বোলার নেই – দাঁড়িয়ে আছেন ৫ ফিট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার এক গোলাবারুদ।
অনেকে গতির ঝড়ে আতঙ্ক ছড়ান, কিন্তু শামি ভিন্ন ধাতুতে গড়া। তাঁর আসল শক্তি অস্ত্রের মতো ধারালো আপরাইট সিমে, যা বাতাসে দিক বদলে ঠিক সেই ফাঁক গলে স্টাম্প গুঁড়িয়ে দেয়, যেখানে ব্যাটারের ডিফেন্সের সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়। উত্তর প্রদেশের মেঠো পথ থেকে ব্যক্তিগত জীবনের চরম অন্ধকার সুড়ঙ্গ পার হওয়া এই ফাস্ট বোলারের প্রতিটি স্পেল আসলে জীবনযুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর এক জ্যান্ত দলিল।
উত্তর প্রদেশের আমরোহা জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম সহজহসপুর থেকে শুরু হয়েছিল শামি নামের সেই কিশোরের যাত্রা। গ্রামের মেঠো পথে বোলিং করার সময় বাবা তৌসিফ আহমেদ প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন ছেলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অদ্ভুত এক আগুন।

কিন্তু স্থানীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব ও সুযোগের দরজায় বারবার ধাক্কা খেয়ে শেষমেশ কলকাতা পাড়ি জমান শামি। ক্লান্তিহীন পরিশ্রমে ক্লাবের গণ্ডি পেরিয়ে একসময় বাংলার রঞ্জি দলে সুযোগ এবং তারপর ২০১৩ সালে শচীন তেন্ডুলকরের বিদায়ী টেস্ট সিরিজে ভারতীয় জাতীয় দলে রাজকীয় আত্মপ্রকাশ। অভিষেক টেস্টেই নয় উইকেট নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকে জানান দিয়েছিলেন – এক নতুন ধুমকেতুর আগমন ঘটেছে।
শামির বোলিংয়ের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য তাঁর ‘আপরাইট সিম’। যখন বলটি তাঁর হাত থেকে বের হয়, বাতাসে তা এমন এক অনবদ্য ভঙ্গিতে ভাসতে থাকে যা যেকোনো বিশ্বসেরা ব্যাটারের মনে আতঙ্কের জন্ম দিতে বাধ্য। রিভার্স সুইং কিংবা নতুন বলের ধার – দুটোকেই সমান তালে নিয়ন্ত্রণ করার বিরল ক্ষমতা তাঁর রয়েছে।
তবে শামির জীবনী কেবল উইকেটের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। তা অনমনীয় ঘুরে দাঁড়ানোর এক উপাখ্যান। ব্যক্তিগত জীবনের চরম মানসিক ঝড়, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ইনজুরি এবং মিডিয়ার নির্মম সমালোচনার মুখাচ্ছদে ঢেকে গিয়েছিল তাঁর পৃথিবী।

এমন এক সময় গেছে যখন ক্রিকেট থেকে সব কিছু হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু শামি দমে যাননি। ফিটনেস ট্রেইনিং, কঠোর সাধনা আর একাগ্রতার জোরে তিনি প্রতিবার বল হাতে ফিরে এসেছেন ঠিক যেন এক ফিনিক্স পাখির মতো।
২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে সাত ম্যাচে ২৪ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হওয়া কিংবা হ্যাটট্রিক করে বিশ্বমঞ্চে ভারতের জয়ে ভূমিকা রাখা – সবই তাঁর সেই অদম্য মানসিকতারই প্রতিফলন। ২৪ সেলাই নিয়ে পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে পুরো ওভার বল করে যাওয়া শামিকে চেনে গোটা বিশ্ব।
মাঠের বাইরে শান্ত, মৃদুভাষী এই গতিদানব বল হাতে নিলেই হয়ে ওঠেন রুদ্ররূপী। জীবনের সব আঘাতকে তিনি বাউন্ডারি পার করেছেন উইকেটের উপড়ে যাওয়া স্টাম্পের শব্দ দিয়ে।











