তাঁর অভিধানে নেই ‘ক্লান্তি’ শব্দের কোনো অস্তিত্ব। দুই দশক ধরে তিনি ক্লাব আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবুজ মাঠে নির্মোহভাবে দেখিয়েছেন অলিম্পাসের দেবদূতের আশীর্বাদপুষ্ট ফুটবলীয় শিল্পের অনিন্দ্য কারিকুরি।
এই শিল্পীর নাম লোথার হারবার্ট ম্যাথিউস। ম্যাথিউসকে যদি মাঠের এক অপ্রতিরোধ্য ইঞ্জিন বলা হয়, তাহলে হয়ত অত্যুক্তি করা হবে না মোটেও। কারণ, আসলেই তিনি তা।
নিজেদের পেনাল্টি বক্স থেকে প্রতিপক্ষের গোলপোস্ট পর্যন্ত পুরো নব্বই মিনিট তিনি অবিরাম ছুটে বেড়াতেন। তাঁর অদম্য স্ট্যামিনা ফুটবল বিশ্বকে বারবার বিস্মিত করেছে। সঙ্গে রক্ষণভাগ সামলানো থেকে শুরু করে প্রতি-আক্রমণের ঝড় বইয়ে দিতেও তিনি নিয়ামক হয়ে উঠতেন মাঠে। প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিতে তাঁর নিখুঁত, সময়োপযোগী এবং আগ্রাসী ট্যাকলগুলো ছিল কিংবদন্তিতুল্য।

মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের পরিকল্পিত আক্রমণের পসরা নস্যাৎ করা আর দৃঢ় মানসিকতায় সতীর্থদের মাঝে শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার সাহস ছড়িয়ে দিতেও তাঁর জুড়ি ছিল মেলা ভার। এসব গুণাবলিই সর্বকালের সেরা ‘বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার’দের তালিকায় তাঁর নামকে ঠেলে দিয়েছে সবার ওপরে।
ফুটবল বোদ্ধাদের মতে, তথাকথিত ড্রিবলিংয়ের প্রতি তেমন একটা আগ্রহ ছিল না ম্যাথিউসের। তিনি অনন্য টেকনিক্যাল এবিলিটি ও গতির কারিকুরি দেখাতে ভালোবাসতেন মধ্যমাঠে। তাই ত্রিশ বা চল্লিশ গজ দূর থেকে তাঁর মাপা লং পাস সতীর্থদের পায়ে বল পৌঁছে দিত অনায়াসে।
এর পাশাপাশি আরেকটা দারুণ দক্ষতা ছিল এই ডাই ম্যানশ্যাফট ফুটবলারের। যে কোনো পরিস্থিতিতে খেলা পড়ার এক অসাধারণ ঐশ্বরিক ক্ষমতা তাঁর মগজে সহজাতভাবেই আন্দোলিত হত। প্রতিপক্ষ কোনো আক্রমণ গড়ে তোলার আগেই তিনি ঠান্ডা মাথায় ইন্টারসেপশান করে দলকে বাঁচিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকের সূত্রপাত ঘটাতেন। একইসঙ্গে, দুই পায়েই সমানভাবে শক্তিশালী শট নেওয়ার সামর্থ্য একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে প্রতিপক্ষ ডিফেন্সের কাছে ভীতিকর চরিত্রে পরিণত করেছিল।

এতসব ফুটবলীয় দক্ষতার মিশেলে মাঠে ম্যাথিউস হয়ে ওঠেন অজেয়। দীর্ঘ ২০ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে জার্মানির হয়ে পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলার বিরল কীর্তি গড়েন তিনি। এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনবার ফাইনাল খেলেন তিনি। ১৯৮২ সালে পাওলো রসির ইতালি আর ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে একটুর জন্যে জয় বঞ্চিত হয় তাঁর দল। কিন্তু ১৯৯০ সালে দলের ক্যাপ্টেন হয়ে সেই ভুল আর করেননি খোদ ম্যাথিউস। মধ্য মাঠ থেকে প্রায় পৃরতি ম্যাচেই খেলার ভিত গড়ে দিয়ে পশ্চিম জার্মানিকে কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেন ব্যাভারিয়ায় ১৯৬১ সালে জন্মানো এই তারকা।
১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপে রেকর্ড ২৫টি ম্যাচ খেলার কৃতিত্বও নিজের ঝুলিতে ভরেন এই জার্মান মিডফিল্ডার। দেশের হয়ে মোট ১৫০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে জার্মানির ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলারও তিনি। জাতীয় দলের জার্সিতে ২৩টি গোলও আছে তাঁর।
লোথার ম্যাথিউসের পেশাদার ফুটবলে হাতেখড়ি হয় মূলত ১৯৭৯ সালে জার্মান ক্লাব বুরুশিয়া মুনশেনগ্ল্যাডবাখের হয়ে। ক্লাবটির হয়ে পাঁচ বছরে ১৬২টি ম্যাচ খেলেন তিনি, গোল করেন ৩৬টি। এরপর জন্মশহর ব্যাভারিয়ার ক্লাব এবং বুন্দেসলিগার সফলতম দল বায়ার্ন মিউনিখে নাম লেখান তিনি। ক্লাবের হয়ে রেকর্ড সাত বার বুন্দেসলিগা এবং তিনবার জার্মান ডিএফবি পোকাল কাপ জেতেন লোথার। ব্যাভারিয়ানদের হয়ে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ১১৩ ম্যাচে ৫৭ গোল করেন তিনি।

বায়ার্নের হয়ে দ্বিতীয় কিস্তিতে ১৯৯৬ সালে উয়েফা কাপও ঘরে তোলেন ম্যাথিউস। মাঝে ১৯৮৮ সালে চার বছরের জন্য ইতালিতে পাড়ি জমান এই কিংবদন্তি মিডফিল্ডার। সিরি আ-র ক্লাব ইন্টার মিলানের হয়েও নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান ম্যাথিউস। তাঁর অনবদ্য মিডিফিল্ডিং আর নেতৃত্বের বদৌলতে ১৯৮৯ সালে সিরি-আ এবং ১৯৯১ সালে উয়েফা কাপ জয় করে ইন্টার। ১৯৯২ সালে ফের ব্যাভারিয়ায় ফেরেন তিনি, খেলেন ২০০০ সাল পর্যন্ত। মিউনিখের ক্লাবটির হয়ে ১৩৯ ম্যাচে আরও ২৮টি গোল করেন এসময়ে তিনি।
ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও পিছিয়ে ছিলেন না এই ফুটবলার। ১৯৯০ সালে ক্লাব পর্যায়ে ও বিশ্বকাপে জাতীয় দলে দুর্দান্ত ‘সুইপার’ মিডফিল্ডারের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়ে জিতে নেন ব্যালন ডি’অর। ১৯৯১ সালে লাভ করেন ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার খেতাব। এছাড়াও দুইবার জার্মানির সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হন তিনি।
তবে ম্যাথিউসের স্বীকৃতির মাপকাঠি স্রেফ ট্রফি বা সম্মাননার সংখ্যা নয়। জীবিত সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের নিয়ে প্রকাশিত ‘ফিফা ১০০’ তালিকায়৷ তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্রাজিলীয় ফুটবল সম্রাট পেলের সুপারিশ কিংবা তাঁকে মাঠে দিয়েগো ম্যারাডোনার নিজের ক্যারিয়ারের সেরা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ঘোষণা করার মতো ঘটনা—ফুটবলে ম্যাথিউসের শ্রেষ্ঠত্ব কোন পর্যায়ের, তা স্পষ্ট করে তোলে সবার কাছে।
লোথার ম্যাথিউস তাই বিশ্ব ফুটবলের এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্য। ফুটবল মাঠের এক নির্ভীক, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নির্মোহ শিল্পী—যাঁর ক্রীড়া নৈপুণ্যে ফুটবল নিজেই হয়ত হয়ে উঠেছে ভাস্বর!











