অবমূল্যায়িত এক প্লেমেকারের কথা

ফুটবলকে সবাই বলেন গোলের খেলা! কথাটা সত্য। তবুও ক্রীড়াটির কিছু চরিত্র আছেন, যাঁরা স্বার্থপরের মতো স্রেফ গোলের পেছনে ছোটেন না। বরং, পুরো ম্যাচের ছন্দ গড়ে তোলাতেই থাকে তাঁদের সব অনিন্দ্য কারিকুরি। তেমনই এক চরিত্র সেস্ক ফ্যাব্রিগ্যাস।

ফুটবলকে সবাই বলেন গোলের খেলা! কথাটা সত্য। তবুও ক্রীড়াটির কিছু চরিত্র আছেন, যাঁরা স্বার্থপরের মতো স্রেফ গোলের পেছনে ছোটেন না। বরং, পুরো ম্যাচের ছন্দ গড়ে তোলাতেই থাকে তাঁদের সব অনিন্দ্য কারিকুরি। তেমনই এক চরিত্র সেস্ক ফ্যাব্রিগ্যাস।

এই স্প্যানিশ প্লেমকারের যাত্রার শুরু কৈশোরে ঐতিহ্যবাহী লা মাসিয়া একাডেমিতে। সেখান থেকে মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব আর্সেনালের জার্সিতে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক তাঁর। মধ্যমাঠের খেলা নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা, অভিনব ট্যাকটিক্যাল ইন্টেলিজেন্স আর অনবদ্য পাসিং অ্যাকিউরেসির বদৌলতে দ্রুতই তিনি আর্সেন ওয়েঙ্গারের তরুণ দলের প্রাণভোমরা হয়ে ওঠেন।

ফলাফল? মাত্র ২১ বছর বয়সেই তাঁর কাঁধে ওঠে উত্তর লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির অধিনায়কের দায়িত্ব। আর্সেনালের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তাঁর নামের পাশে যুক্ত হয় ৫৭টি গোল এবং ৯২টি অ্যাসিস্টের দারুণ পরিসংখ্যান। বল পায়ে তাঁর দ্রুত সিঙ্গেল টাচ আর নিঁখুত পাসিং ক্ষমতা আর্সেনালের আক্রমণে এনেছিল অনন্য গতিময়তা। ২০০৩ থেকে ২০১১ পর্যন্ত গানার্সদের হয়ে খেলে একটি এফএ কাপ ও কমিউনিটি শিল্ড জেতেন তিনি। হন উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ রানার্সআপও।

কিন্তু, শেকড়ে ফেরার ইচ্ছে কার না হয়? তাই ফ্যাব্রিগ্যাসও ২০১১ সালে ফিরে গিয়েছিলেন শৈশবের ক্লাব বার্সেলোনায়। এরপরই বাঁধে বিপত্তি! ক্যাম্প ন্যুতে ফিরেই জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও সের্জিও বুসকেতসদের মতো তারকার ভিড়ে নিজের স্বতন্ত্র পজিশনটাতে আলো ছড়াতে পারেননি তিনি।

তবুও কাতালানদের হয়ে ১৫১ ম্যাচে ৯২টিরও বেশি গোলে অবদান রেখে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন তিনি। জেতেন লা লিগা, কোপা দেল রে, উয়েফা সুপার কাপ এবং ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপের মতো শিরোপা। তবুও স্পেনের সোনালী প্রজন্মের প্রতাপে যেন তাঁর নৈপুণ্য খানিকটা আড়ালেই থেকে যায়।

সে যাইহোক, মাঝমাঠের এই প্লেমেকার কিন্তু থেমে থাকেননি। ২০১৪ সালে পুনরায় চেলসিতে যোগ দেন তিনি। হোসে মরিনহোর অধীনে দিয়েগো কস্তার সঙ্গে তিনি গড়ে তোলেন এক ড্যাশিং আক্রমণাত্মক জুটি। তাঁদের সেই জাদুকরী রসায়নে চেলসি জিতে নেয় দুটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা। পরবর্তীতে ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড আন্তোনিও কন্তের অধীনেও ফ্যাব্রিগ্যাস দ্যুতি ছড়ান ব্লুজদের হয়ে। চেলসির হয়ে ১৯৮ ম্যাচে ২২টি গোল এবং ৫৭টি অ্যাসিস্টের রেকর্ড গড়েন তিনি।

জাতীয় দল স্পেনের হয়েও ২০০৮ ও ২০১২ সালে ইউরো জয়ের পাশাপাশি ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ে ইনিয়েস্তাকে জয়সূচক গোলের অ্যাসিস্ট করেন ফ্যাব্রিগ্যাস। আর তাতেই স্প্যানিয়ার্ডরা প্রথমবারের মতো বিশ্বজয়ের মুকুট পরে।

এতসব অর্জনের পরও সেস্ক ফ্যাব্রিগ্যাস অবমূল্যায়িতই থেকে গেছেন সর্বত্র। কারণ তিনি স্টিভেন জেরার্ড, ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড, ইনিয়েস্তা কিংবা জাভির মতো হরহামেশা ওপরে উঠে গোল করতেন না, সরাসরি কাঁপাতেন না প্রতিপক্ষের রক্ষণ দুর্গ। তাই স্রেফ অনবদ্য পাসিং অ্যাকিউরেসি আর আক্রমণভাগকে কার্যকর বল জোগান দেওয়ার প্রবণতা তাঁর ওপর ফুটবল বোদ্ধাদের নজর সেভাবে টেনে আনতে পারেনি।

ইতিহাস হয়তো ফ্যাব্রিগ্যাসকে সব সময় শিরোনামে রাখেনি। তবুও ফুটবলীয় নন্দনতত্ত্বের খাঁটি জহুরিদের হৃদয়ে সেস্ক ফ্যাব্রিগ্যাস চিরকাল বেঁচে থাকবেন মধ্যমাঠের এক অনন্য প্লেমেকার হিসেবে।

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link