ফুটবল গোলের খেলা, সত্য! কিন্তু কখনো কখনো কিছু চরিত্র সেই সত্যটাকে পাল্টে দেন নিজেদের সহজাত ডিফেন্সিভ রোলের মধ্য দিয়ে। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে তেমনই এক চরিত্রে রূপ নেন ইতালীয় সেন্টার ব্যাক ফ্যাবিও ক্যানাভারো।
পুরো টুর্নামেন্টে ইতালির হয়ে মাঠে থেকে দেশকে বিশ্বজয়ের সোনালী মুকুট এনে দেন তিনি। সকল ম্যাচেই ওপেন প্লেতে ইতালির গোলপোস্টকে নির্ঝঞ্ঝাট রাখার ক্ষেত্রেও অনবদ্য ভূমিকা তাঁরই। আসরজুড়ে প্রতিপক্ষের সকল বিধ্বংসী আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণের সামনে ক্যানাভারো হয়ে উঠেছিলেন এক দুর্ভেদ্য ও পর্বতসম প্রাচীর। তাই আজ্জুরি সমর্থকরা তাঁর ডাকনাম দিয়ে বসেন: ‘ইল মুরো দি বের্লিনো’ বা ‘দ্য বার্লিন ওয়াল’!
অথচ, প্রথাগত সেন্টার ব্যাকদের মতো দীর্ঘকায় ছিলেন ক্যানাভারো। এই শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে তিনি জয় করে নেন অসামান্য ক্ষিপ্রতা, নিখুঁত টেকনিক ও আত্মবিশ্বাস দিয়ে। শারীরিক আগ্রাসনের চেয়ে তিনি বেশি নির্ভর করতেন খেলার দূরদর্শিতা ও পজিশনিং সেন্সের ওপর। প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকাররা বুঝে ওঠার আগেই চতুরতার সাথে বলের গতিপথ অনুমান করে ইন্টারসেপ্ট করায় অসামান্য দক্ষ ছিলেন তিনি।

একজন সম্পূর্ণ ডিফেন্ডার হিসেবে জোনাল মার্কিং ও ম্যান-মার্কিং উভয় পদ্ধতিতেই সমান সিদ্ধহস্ত ছিলেন ১৯৭৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ইতালির ঐতিহ্যবাহী নেপলস শহরে জন্মানো এই তারকা। এমনকি, দলের প্রয়োজনে দুই প্রান্তের ফুল-ব্যাক হিসেবেও দলকে চমৎকার সার্ভিস দিয়েছেন তিনি।
২০০৬ বিশ্বকাপে অনবদ্য পারফরম্যান্সের বদৌলতে ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য ও ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেন ক্যানাভারো। সেই বছর একই সাথে ব্যালন ডি’অর এবং ফিফা প্লেয়ার অব দ্য ইয়ারের স্বীকৃতি পান ক্যানাভারো। চলতি শতাব্দীতে ডিফেন্ডার হিসেবে এই দুটি সম্মাননা অর্জনের সৌভাগ্য হয়নি আর কারোরই!
জাতীয় দলের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলেও ক্যানাভারোর অর্জনের খাতা সমানভাবে উজ্জ্বল। সিরি আ-র ক্লাব পার্মার হয়ে ১৯৯৯ সালের উয়েফা কাপ, দুটি কোপা ইতালিয়া ও একটি সুপারকোপা ইতালিয়া জয় করেন তিনি। পরবর্তীতে ইন্টার মিলান, জুভেন্টাস কাটিয়ে স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে টানা দুবার জেতেন লা লিগার শিরোপা। জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময়ে খেলেছেন ১৩৬টি ম্যাচ।

ফুটবলে গোল করার পাশাপাশি জমাটবাঁধা রক্ষণও যে কখনো কখনো ট্রফি জয়ের মূল হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, তা প্রমাণ করেছেন ক্যানাভারো। চরম চাপের মুখেও পুরো ডিফেন্স লাইনকে শান্ত রেখে দলকে এগিয়ে নেওয়ার যে জাদুকরী নেতৃত্বগুণ তাঁর ছিল, তা সত্যিই অনন্য। তাই ফুটবল ইতিহাসে ক্যানাভারো চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে।










