বিরাট কোহলির শেষ দূর্গ

ধরাছোয়ার বাইরেও কিছু রেকর্ড থাকে। শচীন টেন্ডুলকারের ১০০ আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি রেকর্ড যেমন। বছরের পর বছর ধরে যেটাকে ছোঁয়া প্রায় অসম্ভব মনে হয়েছে, এখন সেই চূড়ার দিকে তাকিয়ে বিরাট কোহলি।

প্রশ্ন হল, বিরাট কোহলি কি পারবেন? পারবেন সময়ের সঙ্গে নিজের এই অসম লড়াইয়ে জিততে? নিজের শরীর, বয়স, সুযোগ আর শেষ হয়ে আসা ক্যারিয়ারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লড়ে যাচ্ছেন কিং কোহলি।

কোহলির আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি এখন ৮৬টি। শচীনের ১০০ ছুঁতে দরকার আরও ১৪টি। আর ১০১-এ পৌঁছাতে পারলেই রেকর্ডটা হয়ে যাবে কোহলির।

কিন্তু একটা বড় পরিবর্তন হয়ে গেছে এরই মধ্যে। এই ১৫টি সেঞ্চুরির জন্য কোহলির হাতে এখন আর তিনটি ফরম্যাট নেই। টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন ২০২৫ সালের ১২ মে। তার আগেই শেষ করেছেন টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছানোর একমাত্র পথ এখন ওয়ানডে।

আর সময়ও খুব বেশি নেই হাতে। শচীনকে ছাড়িয়ে যেতে দরকার আরও ১৫ টা সেঞ্চুরি। ২০২৩ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেই কোহলি প্রথমবার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, শচীনের সবচেয়ে বড় ওয়ানডে রেকর্ডটাও একদিন তার হতে পারে। মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে সেদিন ৫০তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করে ভেঙেছিলেন শচীনের ৪৯ সেঞ্চুরির রেকর্ড।

সর্বশেষ ওয়ানডে সেঞ্চুরিটাও এসেছে তার চেনা কোহলি-সুলভ ভঙ্গিতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচে অপরাজিত ১৩৯ রান। সঙ্গে ৫৫তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি। কিন্তু পরের ম্যাচে ২৯ রান। তৃতীয় ম্যাচে প্রথম বলেই আউট।

একটা সেঞ্চুরি এসেছে। তারপরই আবার নীরবতা। টানা দুই ম্যাচে কার্যত ব্যর্থ তিনি। তারপরও সুযোগ আছে।

২০২৭ বিশ্বকাপের আগে ভারতের নিশ্চিত ১১টি ওয়ানডে রয়েছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচটি, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিনটি এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিনটি। এর সঙ্গে যোগ হতে পারে ২০২৭ এশিয়া কাপ। বাংলাদেশে ১৮ জুন থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত হওয়ার কথা এই আসর। ওয়ানডে ফরম্যাটে টুর্নামেন্টটি ফিরলে ভারত ফাইনালে উঠলে সর্বোচ্চ ছয়টি ম্যাচ খেলতে পারে।

তারপর বিশ্বকাপ। ৭ অক্টোবর দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারতের ম্যাচ দিয়ে শুরু হওয়ার কথা বিশ্বকাপ অভিযান। ভারত শেষ পর্যন্ত গেলে টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ১৩টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেতে পারে।

অর্থাৎ সুযোগের অভাব হয়তো হবে না। কিন্তু ১৫টি সেঞ্চুরি কি আদৌ এই যাত্রায় সম্ভব? অসম্ভবকে সম্ভব করাই তো বিরাট কোহলির কাজ। তিনি কি পারবেন?

কোহলির সাম্প্রতিক ওয়ানডে পরিসংখ্যান বলছে, তার সবচেয়ে বড় শক্তি এখনও দেশের মাটিতে ব্যাটিং। ভারতের শেষ ৩২ ওয়ানডেতে তার সেঞ্চুরি ৯টি। বিদেশের শেষ ৩২ ম্যাচে তিনটি।

সামনে আবার নিউজিল্যান্ডে পাঁচটি ওয়ানডে। তারপর ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ে। শ্রীলঙ্কা অবশ্য কোহলির প্রিয় প্রতিপক্ষদের একটি। তাদের বিপক্ষে ১০টি ওয়ানডে সেঞ্চুরি করেছেন তিনি। কোনো একটি দলের বিপক্ষে এটাই তার সর্বোচ্চ। ডিসেম্বরের ১৩, ১৬ ও ১৯ তারিখে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজ খেলার কথা ভারতের। এরপর জানুয়ারির ৩, ৬ ও ৯ তারিখে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ওয়ানডে।

এই ম্যাচগুলো তাই শুধু সিরিজের ম্যাচ নয়। কোহলির জন্য প্রতিটি ম্যাচ এখন বড় হয়ে উঠছে। কারণ প্রতিটি ইনিংসের সঙ্গে ছোট হয়ে আসছে তার সময়।

বিদেশের মাটিতেও অবশ্য কোহলি কম যান না। ৫৫টি ওয়ানডে সেঞ্চুরির ২৭টি এসেছে ভারতের বাইরে। বাংলাদেশে করেছেন ছয়টি। শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ায় পাঁচটি করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজে চারটি এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনটি।

অর্থাৎ কোহলির ব্যাটের জন্য কোনো মাঠই পুরোপুরি অপরিচিত নয়। আর বিশ্বকাপ তো তার সবচেয়ে বড় মঞ্চ। ৩৭ বিশ্বকাপ ম্যাচে ১,৭৯৫ রান। গড় ৫৯.৮৩। সেঞ্চুরি পাঁচটি। হাফ সেঞ্চুরি ১২টি।

২০২৩ বিশ্বকাপে তো কোহলি ছিলেন নিজের সেরা ফর্মে। ১১ ম্যাচে ৭৬৫ রান। তিনটি সেঞ্চুরি। ছয়টি হাফ সেঞ্চুরি। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। আর সেই বিশ্বকাপেই এসেছিল ৫০তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি।

কোহলি ইতোমধ্যেই ওয়ানডেতে ১৫ হাজার রান পেরিয়েছেন। শচীনের পর দ্বিতীয় ব্যাটার হিসেবে এই মাইলফলকে পৌঁছেছেন তিনি। ৩০৩তম ইনিংসে ১৫ হাজার ওয়ানডে রান পূর্ণ করেছেন।

তবে, রান ছাপিয়ে কোহলির দৃষ্টি এখন একটা সংখ্যায় – ১০১! মানে এমন এক জায়গায় পৌঁছে যাওয়া, যেখানে এর আগে কোনো ব্যাটার যেতে পারেননি। কোহলি নিজেই জানিয়েছেন, ২০২৭ বিশ্বকাপ হতে পারে ভারতের হয়ে তার শেষ বিশ্বকাপ। আরও অনেক অসম্ভব যাত্রার মত এই যাত্রাতেও কি শেষ বেলায় হাসি ফুটবে কোহলির ঠোঁটৈই? রাজার শেষ বিজয়যাত্রার সাথেই কি যুক্ত হবে রেকর্ডের মহার্ঘ্য সেই পালক?

যতবার তাকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, ততবার ব্যাট হাতে উত্তর দিয়েছেন তিনি। এবারও উত্তর জানতে সময়ের অপেক্ষা করার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link