বিশ্ব ফুটবল শেষবারের মতো বলবে, ‘ধন্যবাদ, মেসি।’ নব্বইয়ের কিশোররা এই ভোরে কাঁদবে, চোখের জলের ভাষায় লেখা থাকবে এক রাশ জাদুকরী শৈশব। এই ভোরের সূর্য উদয়ের সাথে সাথে মেসির মায়া কাটিয়ে ওঠার অর্থহীন এক চেষ্টা চলবে বটে, তবে সেই চেষ্টায় সাফল্য আসবে না। বারবার লিওনেল মেসির মায়ায় আটকে যাবে পৃথিবী।
একুশ বছর আগে যে সূর্যটা বিশ্ব ফুটবলের আকাশে উঠেছিল, সেই সূর্য যেন গোধূলির আলোয় নিজের শেষ সোনালি আভাটুকু ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত। আকাশি-সাদা জার্সি, বুকের ওপর ১০ নম্বর, বুয়েন্স আয়ার্সের সেই চেনা গ্যালারি আর এস্তাদিও মনুমেন্তাল। সবকিছুকে সাক্ষী রেখে নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামছেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
প্রতিপক্ষ বেনিন। কিন্তু সত্যি বলতে, এই ম্যাচে বেনিন যেন নেহাতই একটি উপলক্ষ। আসল গল্প একজন মানুষকে ঘিরে। একজন ফুটবলারকে ঘিরে। একজন কিংবদন্তিকে ঘিরে।
শেষবারের মতো সেই বাঁ পায়ের জাদু চোখে ধারণ করতে, শেষবারের মতো ‘মেসি’ নামটা শুনে গ্যালারি কাঁপাতে প্রস্তত বিশ্ব। ভাবুন তো, লকাররুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো আকাশি-সাদা ১০ নম্বর জার্সিটা গায়ে জড়াচ্ছেন মেসি। কত স্মৃতি তখন ফিরে আসবে তাঁর চোখে? কত অসম্ভব জয়? কত প্রত্যাখ্যান? কত হাজারও অশ্রুসজল স্মৃতি?

মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর রেফারি বাঁশিতে ফুঁ দেবেন। শুরু হবে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সুন্দর মহাকাব্যের শেষের কবিতা।
আর সেই কবিতার শুরুটাও হয়েছিল এই মনুমেন্তালেই। সালটা ২০০৫। ৯ অক্টোবর। আর্জেন্টিনার জার্সিতে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার কয়েক দিন পর ঘরের মাঠে পেরুর বিপক্ষে নামলেন ১৮ বছরের এক লাজুক কিশোর। হাঙ্গেরির বিপক্ষে অভিষেকে মাঠে নেমে মাত্র এক মিনিটের মধ্যে লাল কার্ড দেখে যে ছেলেটা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল, সেই মেসিই মনুমেন্তালের ঘাসে এসে যেন নিজের গল্পটা নতুন করে লিখতে শুরু করলেন।
সেদিন আর্জেন্টিনা জিতেছিল ২-০ গোলে। কেউ হয়তো তখনও বুঝতে পারেনি, এই মাঠেই একদিন একটি প্রজন্মের সবচেয়ে বড় ফুটবল নায়ক নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ খেলবেন।
কিন্তু সময় সব জানে। জানে ফুটবল বিধাতা। এই মনুমেন্তাল মাঠ মেসিকে কখনো খালি হাতে ফেরায়নি। এখানে ২৮ ম্যাচ খেলেছেন তিনি। একটিতেও হারেনি আর্জেন্টিনা। করেছেন ১৯ গোল, সঙ্গে ১১টি অ্যাসিস্ট। কোনো একটি নির্দিষ্ট ভেন্যুতে মেসির করা গোলের সংখ্যার হিসাবেও এটিই সর্বোচ্চ।

অর্থাৎ এই মাঠে মেসি শুধু ফুটবল খেলেননি। নিজের জীবনের একটা অংশ রেখে গেছেন। আজ সেই একই মাঠে বৃত্তটা পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তবে এই বিদায়ের পেছনে শুধু বয়স নেই। আছে দীর্ঘ এক যাত্রার ক্লান্তি। আছে ব্যক্তিগত শোক। আছে অপূর্ণতার সঙ্গে লড়াই। আর আছে নিজের দেশকে কিছু একটা ফিরিয়ে দেওয়ার অদম্য জেদ।
হোটেল রুমের নির্জনতায় লেখা সেই অবসরের নোটের কথা মনে পড়ে। নিউজার্সির হৃদয়ভাঙা ফাইনালের পর একসময় মনে হয়েছিল, আর নয়। জাতীয় দলের জার্সিটা হয়তো এবার সত্যিই তুলে রাখবেন। কিন্তু মেসির গল্প এত সহজে শেষ হওয়ার ছিল না।
একদিকে ছিলেন তাঁর বাবা হোর্হে মেসি। জীবনের পরম আশ্রয়, বিশ্বাসের জায়গা, সেই মানুষটি যিনি ছেলের স্বপ্নে কখনো আস্থা হারাননি। বাবার ইচ্ছাতেই মেসি শেষ বিশ্বকাপ খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আর অন্যদিকে ছিল আর্জেন্টিনার জার্সি।
এই জার্সির জন্য মেসির কত কিছু সহ্য করতে হয়েছে, তার হিসাব করা কঠিন। বার্সেলোনার হয়ে একের পর এক সাফল্য। কিন্তু জাতীয় দলের জার্সিতে যেন সবকিছু উল্টো। ট্রফি আসছে না। ফাইনালে উঠছেন, হারছেন। আবার উঠছেন, আবার হারছেন। সমালোচনা বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে, মেসি কি সত্যিই আর্জেন্টিনার জন্য নিজের সবটুকু দেন?

২০১৬ সালে কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই মন্তব্যও কম কাঁটা হয়ে বিঁধেনি। মেসি ভালো মানুষ, ভালো খেলোয়াড়, কিন্তু আদর্শ নেতা হওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব তাঁর নেই, এমন কথাও শুনতে হয়েছে তাঁকে। ১৯৯৩ সালের পর দীর্ঘ ২৩ বছর আন্তর্জাতিক শিরোপাহীন ছিল আর্জেন্টিনা। সেই ২৩ বছরের ১০ বছর মেসি নিজেই ছিলেন দলের অংশ। এক দশক ধরে ট্রফির কাছে গিয়ে ফিরে আসার যন্ত্রণা তাঁকে ভেতর থেকে কতটা বদলে দিয়েছিল, তা হয়তো মেসি ছাড়া আর কেউ জানেন না।
২০১০ বিশ্বকাপেও ব্যর্থতা। ২০১৪ সালে অধিনায়ক হয়ে দলকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলা। কিন্তু মারাকানায় জার্মানির কাছে হার।
তারপর ২০১৫। আবার কোপা আমেরিকার ফাইনাল। আবার হার। ২০১৬। আবার কোপা আমেরিকার ফাইনাল। আবার চিলির কাছে পেনাল্টি শুটআউটে পরাজয়। একসময় নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন মেসি। চারপাশের সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ফুটবল শুধু দৌড়ানো কিংবা গায়ের জোর দেখানোর খেলা নয়। ফুটবল একটি খেলা, যেখানে কৌশলও আছে, বুদ্ধিও আছে।
মেসির সেই কথাগুলো বুঝেছিলেন একজন – লিওনেল স্কালোনি। বলেছিলেন, ‘তুমি ম্যারাডোনা নও, তুমি মেসি। আর আমরা সবাই তোমার পাশে আছি।’

এই কথাটাই যেন মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। স্কালোনি বুঝেছিলেন, মেসিকে বদলানোর দরকার নেই। বরং মেসিকে বুঝতে হবে। তাঁর জন্য দলকে বদলাতে হবে। মেসির চারপাশে তৈরি হলো নতুন আর্জেন্টিনা।
পুরোনো অনেক মুখ সরে গেল। ২০২২ বিশ্বকাপের দলে আগের প্রজন্মের হাতে গোনা কয়েকজনই টিকে রইলেন। নিকোলাস ওতামেন্দি, আলেহান্দ্রো গোমেজ আর অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার মতো কয়েকজন অভিজ্ঞ মুখের সঙ্গে যোগ হলো একঝাঁক তরুণ।
তাদের সবার মধ্যে একটা জায়গায় অদ্ভুত মিল ছিল।
তারা মেসিকে ভালোবাসত। মেসিকে বোঝার চেষ্টা করত। স্কালোনি মেসিকে কোনো নির্দিষ্ট পজিশনে আটকে রাখলেন না। মাঠে তাঁকে নিজের মতো হাঁটতে দিলেন। কখন কোথায় যাবেন, কখন নিচে নামবেন, কখন সামনে উঠবেন, সিদ্ধান্তটা থাকল মেসির কাছেই।
আর বাকিরা নিজেদের মানিয়ে নিলেন তাঁর সঙ্গে। এটাই ছিল বদলের শুরু। মেসিও বদলে গেলেন। আগের মতো প্রতিটি আক্রমণের দায়িত্ব একা কাঁধে নেওয়ার চেষ্টা করলেন না। সবসময় গোল করার জন্য ছুটলেন না। কখনো একটু পিছিয়ে এলেন। কখনো বল ধরে রাখলেন। কখনো একজনকে কাটিয়ে আরেকজনকে পাস দিলেন। কখনো নিজে গোল না করে সতীর্থকে গোল করালেন।

সবচেয়ে বড় কথা, তিনি বুঝে গেলেন, কিংবদন্তি হতে হলে প্রতিটি মুহূর্তে অলৌকিক কিছু করতে হয় না। কখনো কখনো শুধু নিজের মতো থাকাটাই যথেষ্ট। তারপর এল ২০২১। কোপা আমেরিকা। ব্রাজিলের মাটিতে আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান। মেসির হাতে উঠল প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি।
এরপর ২০২২, কাতার। বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে মেসি দাঁড়িয়ে আছেন। যে ট্রফির জন্য বছরের পর বছর তাঁকে শুনতে হয়েছে নানা কথা, যে ট্রফি তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে থাকা শেষ বড় প্রশ্নটির উত্তর হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর হাতে। ম্যারাডোনার দেশের মানুষ আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
আর মেসি তখন আর শুধু বার্সেলোনার সেই বিস্ময়বালক নন। আর শুধু রোজারিওর সেই গ্রোথ হরমোনজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ছোট্ট ছেলেটিও নন। তিনি তখন সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক পূর্ণাঙ্গ কিংবদন্তি। একজন ‘সুপার কিড’ থেকে ‘গোট’ হয়ে ওঠার গল্প।
তবু আজও মেসির গল্পের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটা হয়তো তাঁর অর্জন নয়। বরং বারবার পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। একসময় তাঁকে বলা হয়েছে নেতা নন। দেশের জন্য খেলেন না। জাতীয় দলের জার্সির টান অনুভব করেন না। ফাইনালে ব্যর্থ হন বারবার। ট্রফি জেতাতে পারেন না আর্জেন্টিনাকে।
কিন্তু তিনি কোনো কথার জবাব মুখে দেননি। জবাব দিয়েছেন মাঠে। ধীরে ধীরে, একটা একটা করে। তিনি সবার হয়ে বদলা নিয়েছেন। কোপা আমেরিকা দিয়ে। বিশ্বকাপ দিয়ে। আর শেষ পর্যন্ত নিজের দেশের মানুষের হৃদয়ে এমন একটা জায়গা করে নিয়ে, যেখান থেকে তাঁকে সরানোর ক্ষমতা কারও নেই।

মেসির বিদায় তাই একটি প্রজন্মের শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক নামের বিদায়। যেই ভদ্রলোক গোটা বিশ্বকে চোখ রাঙিয়ে বলে গেছেন, বারবার বিধ্বস্ত হয়েও উঠে দাঁড়ানোর নামই বিশ্বজয়। শেষ বাশি বাজার আগে নিজেকে উজার করে ছিনিয়ে আনা একটা গোলের নামই জীবন।










