বাংলাদেশ এখন বড় বেশি নখদন্তহীন

ক্রিকেটে প্রতিদিন জেতা যায় না। কিন্তু প্রতিদিন লড়াই করা যায়। বাংলাদেশ এখন সেই লড়াইটাই যেন ভুলে যাচ্ছে। সমস্যা শুধু হেরে যাওয়া নয়। সমস্যা হলো, লড়াই না করেই হেরে যাওয়াটা যেন অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশ শুধু জিততে হিমশিম খাচ্ছে না। দলটা যেন ক্রমেই নখদন্তহীন হয়ে পড়ছে।

শরিফুলকে আউট করে রশিদ খান যখন তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন, চার-পাঁচ বছর আগে এই দৃশ্য দেখলে রক্তে আগুন ধরে যেত। মনে হতো, পরেরবার দেখা হলে এর জবাব দিতেই হবে। প্রতিশোধের নেশা চেপে বসত। এবার রাগ নয়, কেবল হতাশ হতে হয়েছে।

মনে হয়েছে, এই দলটার ভেতরে সেই লড়াই করার জেদটাই আর নেই। কেউ যেন বলতে চান না, আজকের দায়িত্বটা আমার। মরব, তবু লড়ে মরব। যিনি ব্যাটিংয়ে সেট, তিনিও দায়িত্ব নিতে চান না। যিনি নতুন ব্যাটার হিসেবে নামছেন, তিনিও না। সবাই খেলতে এসেছেন, লড়তে নয়।

বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের টেকনিক্যাল দুর্বলতা নতুন নয়। সাইফ হাসানের ব্যাটিংয়ে সমস্যা আছে। তানজিদ তামিম ফ্রন্ট ফুটে শরীরের ভার সামনের দিকে নিয়ে আসেন। বলের লাইন ও লেংথ বুঝতে ভুল করেন। চোখ দিয়ে বল অনুসরণ করার বদলে অনেক সময় ব্যাট দিয়ে বলের পেছনে ছোটেন। নাজমুল হোসেন শান্তর ব্যাটিংয়েও একই ধরনের সমস্যা দেখা যায়।

বোলিংয়েও ঘাটতি আছে। শরিফুল ইসলাম জাম্পের আগে থেমে যান। মুস্তাফিজুর রহমান ল্যান্ডিং ক্রিজে পৌঁছানোর আগেই গতি কমিয়ে ফেলেন। ফলে রান-আপ থেকে তৈরি হওয়া মোমেন্টাম ডেলিভারি পর্যন্ত ঠিকমতো কাজে লাগে না। মোস্তাফিজের রান-আপ ছোট করেও লাভ হতে পারে, যদি সেই গতি বল ছাড়ার আগের ধাপ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেন।

এসব সমস্যা বহুদিনের। কিন্তু শুধু টেকনিক্যাল দুর্বলতা দিয়ে বাংলাদেশের আজকের অবস্থার ব্যাখ্যা হয় না। যে জায়গাটা বদলে গেছে, সেটা মানসিকতা। বাংলাদেশকে আজ বড় বেশি নিঃস্ব মনে হচ্ছে।

রশিদ খান যখন পঞ্চম ওভারে বোলিংয়ে এলেন, তখনও উইকেট পাননি। বাংলাদেশের চার উইকেট পড়ে যাওয়ার পরও প্রত্যাশিত সাফল্য না আসায় তাঁর শরীরী ভাষায় বিরক্তি ছিল। নিজের ওপর ক্ষোভ ছিল। সাইফকে উদ্দেশ্য করে বল ছুড়ে মারার ঘটনাতেও সেই অস্থিরতা দেখা গেছে।

সেই মুহূর্তটা বাংলাদেশের জন্য সুযোগ হতে পারত। প্রতিপক্ষের সেরা বোলার যখন অস্থির, তখন তাঁকে আরও অপেক্ষা করানো দরকার। উইকেটে টিকে থেকে তাঁর পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়া দরকার। তাতে আফগানিস্তানের আক্রমণাত্মক মেজাজেও চাপ পড়তে পারত।

কিন্তু সাইফ ডাউন দ্য উইকেটে গিয়ে এমন একটা বল আকাশে তুলে দিলেন, যেটা খেলতেই হতো না। তখন দ্রুত রান তোলার তাড়াও ছিল না। দরকার ছিল ধৈর্য আর পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা। মনে হলো, ব্যক্তিগত ইনিংসের গতি কমে যাচ্ছে, স্ট্রাইক রেট হয়তো মাথায় ঘুরছে। তাই ঝুঁকি নিতেই হবে।

অথচ পেশাদার ক্রিকেটের আসল পরীক্ষা এখানেই। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের খেলা বদলে নেওয়া। ব্যক্তিগত ইগো সরিয়ে দলের প্রয়োজনে টিকে থাকা। নিজের অর্জনের চেয়ে দলকে বড় করে দেখা। শুধু অনুশীলন, ম্যাচ খেলা কিংবা চুক্তির টাকা নেওয়াই পেশাদারত্ব নয়। দায়িত্ব নিয়ে লড়াই করাটাও তার অংশ।

তানজিদ তামিম আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করতে চান। কিন্তু প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার সেই জেদ কোথায়? সাইফের মধ্যে কোথায় সেই আত্মবিশ্বাস, যে তাঁকে আউট করতে হলে বোলারকে সেরাটাই দিতে হবে? শান্ত কিংবা তাওহীদ হৃদয়ের মধ্যেও কেন শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার দৃঢ়তা ধারাবাহিকভাবে দেখা যায় না?

হৃদয় বাংলাদেশের ধারাবাহিক ব্যাটারদের একজন। তাঁর সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু সামর্থ্য আর গ্রিট এক জিনিস নয়। ভালো ব্যাটার হওয়া আর প্রতিপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া যে আপনি সহজে হার মানবেন না, দুটো আলাদা ব্যাপার।

এই জায়গায় তাসকিন আহমেদকে আলাদা করে দেখতে হয়। তাঁর ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন আছে। শরীর সব সময় সঙ্গ দেয় কি না, সেটাও প্রশ্ন। ফিল্ডিংয়ে তাঁকে আড়াল করে রাখতে হয়। কিন্তু বল হাতে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টাটা অন্তত চোখে পড়ে। চেষ্টা সব সময় সফল হবে না। তবে চেষ্টা না থাকলে সাফল্যের সম্ভাবনাও একসময় মরে যায়।

বাংলাদেশ এ বছর বড় দলের বিপক্ষেও সিরিজ জিতেছে। কিন্তু একজন বা দুজনের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে সিরিজ জেতা আর পুরো দলকে একটা ক্রিকেটীয় সংস্কৃতিতে গড়ে তোলা এক নয়। দল হয়ে উঠতে হলে লড়াইয়ের মানসিকতা ছড়িয়ে দিতে হয় পুরো একাদশে।

বাংলাদেশের ওয়ানডে দলকে দেখে এখন অনেক সময় মনে হয়, তারা জানে না কখন ধৈর্য ধরতে হবে, কখন প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে হবে, কখন উইকেট আগলে রাখতে হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাতেই যেন শূন্যতা।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হার নয়। টেকনিক্যাল দুর্বলতাও নয়। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, হারার আগে প্রতিপক্ষকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা।

রশিদ খানের হাসির জবাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ দেখিয়ে দিতে হবে না। জবাব দিতে হবে মাঠে। এমন একটা ইনিংস, এমন একটা স্পেল, এমন একটা প্রতিরোধ দিয়ে, যাতে পরেরবার হাসার আগে তাঁকে একবার ভাবতে হয়। যাতে মনে থাকে, বাংলাদেশকে হারানো যায়, কিন্তু তাদের লড়াই থামানো সহজ নয়।

টেকনিক্যাল ত্রুটি শুধরাতে হবে। ব্যাটিং ও বোলিংয়ের ভুল নিয়ে কাজ করতে হবে। কিন্তু তার আগে দরকার সেই লড়াকু সত্তাটাকে ফিরিয়ে আনা, যে ব্যর্থ হলেও হাল ছাড়ে না, চাপে পড়লেও পালিয়ে যায় না, উইকেট হারালেও পরের বলের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে।

ক্রিকেটে প্রতিদিন জেতা যায় না। কিন্তু প্রতিদিন লড়াই করা যায়। বাংলাদেশ এখন সেই লড়াইটাই যেন ভুলে যাচ্ছে। সমস্যা শুধু হেরে যাওয়া নয়। সমস্যা হলো, লড়াই না করেই হেরে যাওয়াটা যেন অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশ শুধু জিততে হিমশিম খাচ্ছে না। দলটা যেন ক্রমেই নখদন্তহীন হয়ে পড়ছে।

লেখক পরিচিতি

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক

Share via
Copy link