সময়ের বিচারে হেরে যাওয়া পাঁচ প্রতিভার গল্প!

এই পাঁচজন যেন প্রমাণ করে গেছেন, ক্রিকেটে প্রতিভা একাই যথেষ্ট নয়, তার সঙ্গে সময়ের সুবিচারও লাগে।

বিরাট কোহলি যদি জন্মাতেন শচীন, দ্রাবিড়, গাঙ্গুলী, লক্ষ্মণ আর শেবাগের যুগে, কিংবা জো রুট যদি মাইকেল ভন, স্ট্রস, ট্রেসকোথিক, পিটারসেন এর যুগে জন্মাতেন তাহলে কী হতো? যে মানুষ দুটো রান করে করে রেকর্ডের খাতা ভরিয়ে ফেলেছেন, তাঁদের হয়তো পুরো ক্যারিয়ার কাটাতে হতো টেস্ট দলের দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে।

কথাটা শুনতে কল্পনার মতো লাগে,কিন্তু ক্রিকেট ইতিহাসে এই কল্পনাটাই সত্যি হয়েছে পাঁচজন মানুষের জীবনে। তাঁরা প্রতিভায় কারও চেয়ে কম ছিলেন না, কম ছিলেন শুধু সময়ের হিসাবে। অন্য কোনো যুগে জন্মালে এঁরা হতেন নিজের দেশের নিয়মিত একাদশের নাম।

স্টুয়ার্ট ল-র গল্প শুরু হয় পার্থে, ১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। অস্ট্রেলিয়া তখন এমন এক দল, যেখানে মার্ক ওয়াহ আছেন, স্টিভ ওয়াহ আছেন, কিছুদিন পরে আসবেন পন্টিং আর মার্টিন, ব্যাটিং লাইনআপে ফাঁকা জায়গা বলে কিছু নেই। স্টিভ ওয়াহ চোট পাওয়ায় স্টুয়ার্ট ল হুট করে সুযোগ পেয়ে যান, ছয় নম্বরে নেমে অপরাজিত ৫৪ করলেন, অধিনায়ক টেলর ৬১৭ রানে ইনিংস ঘোষণা করে দিলেন, আর ওখানেই শেষ। ওয়াহ ফিরলেন, ল বাদ পড়লেন। ওই ম্যাচেই অভিষেক হয়েছিল পন্টিংয়ের, যিনি পরে খেলেছেন ১৬৮ টেস্ট। স্টুয়ার্ট ল-র টেস্ট গড়ের ঘরে বসল শুধু একটা তারকাচিহ্ন, যেটা অপরাজিত থাকার চিহ্ন, আর সাথে যোগ হলো দীর্ঘশ্বাসের গল্প।

ঘরোয়া ক্রিকেটে সাতাশ হাজারের বেশি রান, ৭৯টি সেঞ্চুরি, গড় পঞ্চাশের ওপরে, কুইন্সল্যান্ডের সর্বোচ্চ রানের মালিক, এসেক্সের কাউন্টি মাঠে রীতিমতো রাজা। ওয়ানডে খেলেছেন ৫৪টি, ১৯৯৬ বিশ্বকাপে করেছেন ২০৪ রান, তবু ব্যাগি গ্রিন আর কোনোদিন মাথায় দেওয়া হয়নি।

ভারতের অমল মুজুমদার ছিলেন অনেকের চোখে পরের শচীন। তেরো বছর বয়সে স্কুলের মাঠে শচীন আর কাম্বলি যখন ৬৬৪ রানের জুটি গড়ছিলেন, তখন তিনি প্যাড পরে পরের ব্যাটসম্যান হয়ে বসে ছিলেন, ডাক আর আসেনি। রঞ্জি অভিষেকে হরিয়ানার বিপক্ষে অপরাজিত ২৬০ করে মনে হয়েছিল, বোম্বে স্কুলের নতুন স্টার এসে গেছে। কিন্তু তাঁর সময়ে ভারতের মিডল অর্ডারে ঢোকা ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজের একটা, কারণ ভারতীয় দল দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন শচীন, দ্রাবিড়, গাঙ্গুলী আর লক্ষ্মণ।

অমল রান করে গেলেন, ১৭১ ম্যাচে ১১,১৬৭ রান, গড় ৪৮.১৩, ৩০টি সেঞ্চুরি, রঞ্জিতে মুম্বাইয়ের সর্বোচ্চ রান। অধিনায়ক হয়ে শিরোপাও জেতালেন। ক্যারিয়ারের শেষ কিছুদিন আসাম আর অন্ধ্র প্রদেশের হয়ে খেলে ২০১৪ সালে অবসর নিলেন। জাতীয় দলের জার্সি পরা হলো না, কিন্তু ২০২৫ সালে ভারতের নারী দল যখন প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতল, কোচের জায়গায় সেই দুর্ভাগা অমল মুজুমদার।

ব্র্যাড হজ সুযোগ পেয়েছিলেন, আর তিনি তার পুরোটা কড়ায় গন্ডায় দাম দিয়েছিলেন। ২০০৫ সালে হোবার্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অভিষেক, দুই টেস্ট পরেই পার্থে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অপরাজিত ২০৩। ছেলেবেলার নায়ক ডিন জোন্সের মতো তাঁরও প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিটা হয়ে গেল ডাবল সেঞ্চুরি। অথচ এর দুই টেস্ট পরেই তাঁকে বাদ দেওয়া হলো, কারণ হিসেবে শোনা গেল দ্রুত বোলিংয়ে নাকি কারিগরি দুর্বলতা আছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ডাক পেলেন মার্টিন আর ক্লার্ক। দুই বছরের বেশি অপেক্ষার পর ২০০৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে আরেকবার ডাক পেলেন, সেটাই শেষ। ছয় টেস্টে ৫০৩ রান, গড় ৫৫.৮৮। ওয়ানডেতেও একই নাটক, ২০০৭ বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি করে ম্যাচসেরা হলেন আর পরের ম্যাচে জায়গা হারালেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে সতেরো হাজারের মতো রান আর ৫১টা সেঞ্চুরি তাঁকে ভিক্টোরিয়ার কিংবদন্তি বানিয়েছে, কিন্তু জাতীয় দলের সাথে তার যাত্রা আক্ষেপ হয়েই থেকে গিয়েছে।

স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল এমন এক মানুষের সাথে একাদশে জায়গার জন্যে লড়াই করেছিলেন তখন তাকে বাদ দেওয়ার কথা নির্বাচকদের কল্পনাতেও আনা সম্ভব ছিল না, তিনি ছিলেন শেন ওয়ার্ন। দুজনই লেগ স্পিনার, আর অস্ট্রেলিয়া সাধারণত একসঙ্গে দুজন রিস্ট স্পিনার খেলাতে চাইত না। ওয়ার্ন ফিট থাকলে ম্যাকগিল বাইরে, ওয়ার্ন চোট পেলে ম্যাকগিল ভেতরে। এভাবে দশ বছরে খেললেন মাত্র ৪৪ টেস্ট, তার মধ্যে এশিয়ার স্পিন-সহায়ক উইকেটে মাত্র সাতটি। অথচ যে ১৬ টেস্টে দুজন একসঙ্গে মাঠে ছিলেন, সেখানে ম্যাকগিলের উইকেট ৮২টি, গড় ২২.১০,যা ওয়ার্নের চেয়েও ভালো।

২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ওয়ার্ন অবসর নিলেন, ম্যাকগিলকে আগে থেকে জানতেনই না,ম্যাকগিল পরে বলেছেন, খবরটা শুনে তিনি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন, আর ভেবেছিলেন এবার হয়তো নিজের সময় এলো, ৪০০ উইকেটের স্বপ্নও দেখেছিলেন। কিন্তু তখন তাঁর বয়স ছত্রিশ, ডান হাতে অস্ত্রোপচার হয়েছে, শরীর আর সঙ্গ দিচ্ছে না। ২০০৮ সালের জুনে অ্যান্টিগায় টেস্ট চলাকালেই অবসরের ঘোষণা দিলেন, ২০৮ উইকেট নিয়ে। ছায়া সরে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রোদে দাঁড়ানোর মতো সময় আর বাকি ছিল না।

রঙ্গনা হেরাথের গল্পটা এই পাঁচজনের মধ্যে একমাত্র গল্প, যেখানে শেষটা সুন্দর। ১৯৯৯ সালে গলেই অভিষেক, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে, উল্টো প্রান্তে মুত্তিয়া মুরালিধরন। একটা দলে দুজন স্পিন-কিংবদন্তির জায়গা হয় না, তাই এক দশকের বেশি সময় তাঁর কাজ ছিল মুরালির সহযোগী হয়ে রান আটকে রাখা। সেই সময়টায় তিনি দলে ঢুকলেন আর বেরোলেন, ইংল্যান্ডের ক্লাব ক্রিকেটে ঘুরলেন, প্রথম ১৪ টেস্টে উইকেট পেলেন মাত্র ৩৬টি। তারপর একত্রিশ বছর বয়সে ফিরে এসে পাকিস্তানের বিপক্ষে নিলেন ১০ উইকেট।

২০১০ সালে গলেই মুরালি শেষ টেস্ট খেললেন, আর সেই শূন্যস্থানে যিনি বসলেন তাঁর বয়স তখন বত্রিশ ছুঁই ছুঁই। এরপর আট বছরে প্রায় সব টেস্টই খেললেন, ২০১৬ সালে গলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে সিরিজে নিলেন ২৮ উইকেট। ২০১৮ সালে সেই গলেই শেষ টেস্ট খেলে থামলেন ৪৩৩ উইকেট নিয়ে, ইতিহাসের সবচেয়ে সফল বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে। যে মাঠে শুরু, সেই মাঠেই শেষ, মাঝখানের পথটা শুধু একজন মানুষের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার অপেক্ষা।

এই পাঁচজন যেন প্রমাণ করে গেছেন, ক্রিকেটে প্রতিভা একাই যথেষ্ট নয়, তার সঙ্গে সময়ের সুবিচারও লাগে।

Share via
Copy link