যে লড়াইটা বাবার জন্য!

সিলেটে বাংলাদেশ যখন সিরিজ বাঁচাতে লড়ছে, তখন কেভিন উইকহ্যামের লড়াইটা সম্পূর্ণ আলাদা লড়াই। নিজের লড়াই। বাবা হারানোর শোককে পরাজিত করে বাবাকে দেখানো, দেখো আমি ক্রিকেট খেলছি তোমার জন্য, আমি পেরেছি তোমার জন্য।

সিলেটে বাংলাদেশ যখন সিরিজ বাঁচাতে লড়ছে, তখন কেভিন উইকহ্যামের লড়াইটা সম্পূর্ণ আলাদা লড়াই। নিজের লড়াই। বাবা হারানোর শোককে পরাজিত করে বাবাকে দেখানো, দেখো আমি ক্রিকেট খেলছি তোমার জন্য, আমি পেরেছি তোমার জন্য।

উইকহ্যামের বাবার স্বপ্ন ছিল, ছেলে ক্রিকেটার হবে। যেখানেই খেলতে যেত মাঠে না গেলেও ছেলের প্রতিটি খেলার খোঁজখবর রাখতেন তিনি। উইকহ্যাম কত রান করল, কোথায় ভুল করল, কীভাবে আউট হলো সবকিছুর খুঁটিনাটি সবই জেনে নিতেন। বাবার হাত ধরে, বাবার চোখ দিয়ে বড় স্বপ্ন ছোঁয়ার রাস্তা খুঁজত উইকহ্যাম।

তবে সময়ের নিষ্ঠুর কষাঘাত সে স্বপ্নকে দুই ভাগ করে ফেলে। প্রিয় বাবা চলে যান ছেলেকে ছেড়ে। ২০২৪ সালটা পারলে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকেই মুছে ফেলতেন উইকহ্যাম। এই বিয়োগ যে অপূরণীয়, একবার হারালে পাওয়া যায় না, পাওয়া সম্ভব না। মাঝপথে, মাঝসমুদ্রে কিংবা ঘোর অমাবস্যার আঁধারে উইকহ্যামকে একা ফেলে যে চলে গেলেন তাঁর বাবা।

উইকহ্যামের জীবনের খুশির আলো নিভে যায়। শোককে শক্তিতে পরিণত করার মানসিকতা উবে যায়। ক্রিকেটে তাঁর মন বসে না আর। বসবে কী করে, বাবা যে হারিয়ে গেছেন, এত দূরে চলে গেছেন যেখান থেকে যোগাযোগের কোনো উপায় নেই। হাজার ডাকলেও বাবা আসবেন না। উইকহ্যামের তরুণ, সতেজ মনে যে ক্ষতচিহ্ন দেখা দিল তা আর নিরাময় হলো না।

তবে সময়ের সাথে রেষারেষি করে টিকে থাকা যায় কি? উইকহ্যাম আবারও হাতে তুললেন ব্যাট। আবারও নামলেন বাইশ গজে, বাবা হয়তো দেখবেন, রেডিও শোনার মতোই শুনবেন ছেলের কীর্তি। জাস্টিন গ্রিভসের কাছ থেকে যখন টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক ক্যাপটা নিলেন, বন্ধু গ্রিভসও মনে করিয়ে দিলেন, ‘মনে রেখো, তোমার বাবা তোমাকে দেখে আজ গর্বিত হবেন।’

উইকহ্যাম কথাটা টুকে নিলেন। বাবাকে খুশি করতে হবে। ইহলোকে দাঁড়িয়ে ওপারে, কিংবা দূর আকাশের নক্ষত্ররাজির কোথাও যিনি লুকিয়ে আছেন, দূর থেকে দেখছেন, তাঁকে খুশি করতেই হবে। সিলেট টেস্টের প্রথম ইনিংসে ভেঙে পড়া দলের ব্যাটিং অর্ডার সামলে নিলেন। আমির জাঙ্গুর সাথে গড়লেন অবিস্মরণীয় জুটি, কে বলবে খেলতে নেমেছেন প্রথম টেস্ট। ফিফটি তুলে ফিরেছেন সাজঘরে। তবে মন ভরেনি। সারারাত হয়তো একটা কথাই মনে পড়েছে, বাবা কি খুশি হলেন এটাতে?

আরও কিছু করতে হবে। দ্বিতীয় ইনিংসেও তাই ফিফটি হাঁকালেন আর পৌঁছে গেলেন এমন এক রেকর্ডের ঠিকানায়, যা অবিশ্বাস্যই। টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে অভিষেক টেস্ট ম্যাচে ৩২৮৪ জনের মধ্যে দুই ইনিংসে ফিফটি করা ব্যাটারের সংখ্যা মাত্র ৪৫। তাঁদের একজন উইকহ্যাম। প্রথম ইনিংসে ৬১ রান, দ্বিতীয় ইনিংসে ৭৮।

বাবা নিশ্চয় এবার খুশি হবেন, দূর থেকে ছেলেকে বলবেন, আমি জানতাম তুমি পারবে। উইকহ্যামও শান্তিতে একটা রাত নিশ্চয় ঘুমোবেন। তবে এ তো কেবল শুরু, দুই ভাগ হয়ে যাওয়া স্বপ্নটাকে যে জোড়া লাগাতে হবে, পেতে হবে সেসব কিছু, যা বাবা চেয়েছিলেন।

 

লেখক পরিচিতি

স্টাফ রিপোর্টার

Share via
Copy link