জিম্বাবুয়ের নাম শুনলে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অনেক সমর্থকের কাছেই আলাদা কোনো আতঙ্ক তৈরি হয় না। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই মজা করে বলা হয়, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ যেন বড় কোনো পরীক্ষার আগে নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ। শক্তির বিচারে দুই দলের পার্থক্যও অনেক সময় সেই ধারণাকে আরও জোরালো করে।
কিন্তু মাঠের গল্পটা বারবারই ভিন্ন হয়েছে। হারারের মাটিতে গেলেই যেন বদলে যায় বাংলাদেশের চেহারা। যে দল পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই করতে পারে, সেই দলই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে গিয়ে ছন্দ হারায়, অপ্রত্যাশিত ভুল করে এবং হোঁচট খায়। তাই প্রশ্নটা শুধু একটি ম্যাচ হারার নয়, প্রশ্নটা মানসিকতা, প্রস্তুতি আর ধারাবাহিকতার।
২০২২ সালের জিম্বাবুয়ে সফরের কথাই ধরা যাক। টি-টোয়েন্টি সিরিজে ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। এরপর ওয়ানডে সিরিজেও প্রথম দুই ম্যাচ হেরে সিরিজ হাতছাড়া করে, শেষ ম্যাচ জিতে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ শেষ করেছিল জিম্বাবুয়ে। অথচ সেই দলেই ছিলেন সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ ও আফিফ হোসেনের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররা।

চার বছর পর ২০২৬ সালেও যেন সেই পুরোনো গল্পই ফিরে এসেছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে দাপুটে পারফরম্যান্স, অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট—এসবের পর অনেকেই ভেবেছিলেন জিম্বাবুয়ে সফরটা বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির হবে। কিন্তু হারারেতে একমাত্র টেস্টে ইনিংস ও ৮৫ রানের হার, এরপর প্রথম দুই ওয়ানডেতেও পরাজয় আবারও একই প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—জিম্বাবুয়েতে গেলেই কেন ছন্দ হারায় বাংলাদেশ?
এর উত্তর শুধু কন্ডিশনে খুঁজলে ভুল হবে। হারারের উইকেটে পেসাররা বাড়তি সহায়তা পায়, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটাই স্বাভাবিক। বড় দলগুলোও বিদেশে কঠিন কন্ডিশনে খেলে, কিন্তু তারা খুব কমই তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ধারাবাহিকভাবে একই ভুল করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা সম্ভবত মানসিকতার। বড় দলের বিপক্ষে নামলেই টাইগারদের মধ্যে বাড়তি আগ্রাসন, মনোযোগ আর লড়াইয়ের মানসিকতা দেখা যায়। কিন্তু অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সেই তীব্রতা অনেক সময় দেখা যায় না। ম্যাচ যত এগোয়, চাপটা প্রতিপক্ষের ওপর না গিয়ে উল্টো বাংলাদেশের কাঁধেই চেপে বসে।

এটা বলার সুযোগ নেই যে বাংলাদেশ ইচ্ছে করে হারে বা প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নেয়। তবে ফলাফল বলছে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তারা নিজেদের সেরা ক্রিকেটটা খুব কমই খেলতে পারে। আর সেটাই বড় দলের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পার্থক্য। ভারত, অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ড দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সাধারণত ম্যাচকে জটিল হতে দেয় না। বাংলাদেশ এখনও সেই নির্মম অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেনি।
তবে এই সফর এখনও শেষ হয়ে যায়নি। সামনে রয়েছে আরও একটি ওয়ানডে, এরপর তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ। হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার সুযোগ এখনও আছে। সিরিজের ফল হয়তো বদলানো কঠিন, কিন্তু শেষ দুটি ধাপে লড়াই করে ঘুরে দাঁড়াতে পারলে অন্তত এই সফরের গল্পটা কিছুটা হলেও বদলে দিতে পারবে বাংলাদেশ।
কারণ বড় দল হয়ে ওঠার পথে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুধু বড় প্রতিপক্ষকে হারানো নয়, বরং জেতার কথা যে ম্যাচগুলো, সেগুলো নিয়মিত জিতে দেখানোর মানসিকতা তৈরি করা।












