মাঠে যাঁর ব্যাট কথা বলত রানে, আজ সেই মানুষটির অভিজ্ঞতাই হয়তো গড়ে দেবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের আগামীর পথ। ভিভিএস লক্ষ্মণ—নামটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ২০০১ সালের সেই কলকাতা টেস্টের স্মৃতি, যেখানে ফলো-অনে পড়েও রাহুল দ্রাবিড়ের সঙ্গে গড়েছিলেন ২৮১ রানের এক কিংবদন্তি জুটি, হারিয়ে দিয়েছিলেন প্রবল পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়াকে। সেদিন থেকেই তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে যায় এক বিশেষণ—ভেরি ভেরি স্পেশাল লক্ষ্মণ। চব্বিশ বছর পর সেই লক্ষ্মণই এবার বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য হয়ে উঠতে পারেন এক নতুন দিশারি।
বর্তমানে ভারতীয় বোর্ডের সেন্টার অফ এক্সিলেন্স এর দায়িত্বে আছেন লক্ষ্মণ—এমন এক পদ, যেখানে তাঁর আগে দায়িত্ব পালন করেছেন রাহুল দ্রাবিড় নিজেই, পরে যিনি নিয়েছিলেন ভারতের জাতীয় দলের দায়িত্ব। বেঙ্গালুরুর উপকণ্ঠে বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসই এখন ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রস্তুতি কার্যক্রমের প্রাণকেন্দ্র—একসময় যেটি পরিচিত ছিল জাতীয় ক্রিকেট একাডেমি নামে। ইনডোর ও খোলা মাঠের একাধিক অনুশীলন উইকেট, আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা, পুনর্বাসন ইউনিট, আবাসন আর বিশেষায়িত গবেষণাগার—পুরুষ, নারী ও কিশোর, সব পর্যায়ের ক্রিকেটারদের জন্য এক ছাদের নিচে সমন্বিত এক ব্যবস্থা।
ঠিক এই জায়গাটাই এখন দেখতে চায় বাংলাদেশ। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বর্তমানে ভারত সফরে আছে, সঙ্গে আছেন বিসিবি পরিচালক শাহনিয়ান তানিমও। উদ্দেশ্য স্পষ্ট—শুধু চোখে দেখা নয়, ভারত কীভাবে এই কাঠামোয় গড়ে তুলছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, চোট ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসনে কী পদ্ধতি অনুসরণ করছে, মাঠ ও উইকেটের কাঠামোই বা কীভাবে সাজানো—সবকিছু কাছ থেকে বোঝা। প্রতিনিধিদলটি বৈঠক করবে লক্ষ্মণ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে, জানবে খেলোয়াড় উন্নয়ন, ক্রীড়াবিজ্ঞান, শারীরিক গঠন বিশ্লেষণ, শক্তি ও সহনশীলতা প্রশিক্ষণ এবং বয়সভিত্তিক কার্যক্রম কীভাবে একই ছাদের নিচে পরিচালিত হয়।

এই সফর হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এর ঠিক আগের দিনই তামিমের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বিসিবির বোর্ড সভায় অনুমোদন পেয়েছে পূর্বাচল স্টেডিয়াম প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত একটি ক্রিকেট এক্সিলেন্স সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা। অর্থাৎ বেঙ্গালুরু সফরকে শুধু পরিদর্শন হিসেবে দেখলে ভুল হবে—এটা বরং পূর্বাচলে গড়ে ওঠা ভবিষ্যতের সেই কেন্দ্রের বাস্তব রূপরেখা তৈরির প্রস্তুতিপর্ব। বাংলাদেশের মাটিতেই ভারতের এই কাঠামো অনুসরণ করে একটা এক্সিলেন্স সেন্টার গড়ে তোলার স্বপ্ন বহুদিনের, এবার সেই স্বপ্নই যেন বাস্তবতার কাছাকাছি এসে দাঁড়াল।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নানা জটিলতা নিয়ে আলোচনা আছে, থাকবেও। কিন্তু ক্রিকেটীয় দক্ষতা আর অভিজ্ঞতার প্রশ্নে এসব বিতর্ক আলাদা করে দেখাই বিচক্ষণতার পরিচয়। দ্রাবিড়-লক্ষ্মণের মতো ক্রিকেট গ্রেটদের অবদান ছোট করে দেখার সুযোগ নেই—তাঁদের কাছ থেকে শেখার এই উদ্যোগ তাই যুক্তিসংগত ও প্রশংসনীয় এক পদক্ষেপ, যা অতীতে কখনো নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ গড়ার এই প্রচেষ্টায় লক্ষ্মণের অভিজ্ঞতা কতটা কাজে আসে, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।












