​অশ্রু ও হাসির জোয়ারে শেষ হলো মেসিময় অধ্যায়

বলটি আজ হয়তো নীরবে এক কোণে পড়ে থেকে ভাববে, হায়! আমাকে ভালোবেসে আর কেউ কি ওভাবে আগলে রাখবে?

বিদায়ের সুর নাকি সবসময়ই একটু ভারী, একটু করুণ। তবে বুয়েন্স আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে আজ যা ঘটল, তা কেবল এক ফুটবলারের প্রস্থান নয়, একটি আস্ত রূপকথার মহাকাব্যিক সমাপনী। বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি শেষ হতেই যখন রেফারির বাঁশি বাজল, থমকে গেল যেন গোটা ফুটবল বিশ্ব। প্রশ্ন জাগল মনে – আজকের এই বিদায়ী বাঁশিটা কি না বাজালেই চলত না? সময়কে কি আর একটিবারের জন্যও থামিয়ে দেওয়া যেত না?

​আর কোনোদিন মাঠে নেমে বলকে এমন যাদুকরী স্পর্শে নাচাবেন না লিওনেল মেসি। আর কোনোদিন আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর নীল-সাদা জার্সি গায়ে জড়িয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স চুরমার করে একাকী সাম্রাজ্য গড়ে তুলবেন না সেই বাঁ পায়ের জাদুকর।

ম্যাচ শেষে স্টেডিয়ামের প্রতিটি কোণায়, বুয়েন্স আইরেসের অলিগলিতে এমনকি টিভির পর্দায় চোখ রাখা কোটি মানুষের চোখে তখন অশ্রুর ধারা। যে বিশ্ব এতদিন তাঁর পায়ে ফুটবলের অপার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধতায় হেসেছে, আজ সেই পুরো বিশ্ব কাঁদছে তাঁর চলে যাওয়ার বেদনায়। অথচ, এই কান্নার ভিড়ে ফুটবলের চিরন্তন বরপুত্র নিজে হাসছেন। এক প্রশান্তির হাসি, অর্জনের হাসি, সব পাওয়ার পূর্ণতার হাসি। এই প্রথম মেসি হাসলেন, আর তার সাথে অশ্রুসিক্ত হলো পুরো ফুটবল দুনিয়া।

​বিদায়ের এই মাহেন্দ্রক্ষণে ব্যাকুল বিশ্ববাসীর চোখে চোখ রেখে মেসিকে যদি প্রশ্ন করা হতো – না গেলে হয় না লিও? তবে তিনি হয়তো প্রখ্যাত কবি ভাস্কর চৌধুরীর সুরেই মৃদু হেসে বলতেন, ‘তোমাদের দুঃখিত করা আমার জীবনধর্ম নয়। চলে যেতে হয় বলেই যাচ্ছি। নাহলে তো, আরেকটু থাকতাম…’

কিন্তু নিয়তির অমোঘ নিয়মকে অস্বীকার করার উপায় কার আছে? আকাশনীল ভালোবাসার এই জামাটা খুলে তোলার সময় এসেছে। ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যে মানুষটি আর্জেন্টিনার প্রতিটি মানুষের স্বপ্নকে নিজের কাঁধে বহন করেছেন। যে মানুষটি কান্না আর হাহাকারের খরা কাটিয়ে পুরো দেশকে এনে দিয়েছেন বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং ফিনালিসিমার মতো স্বর্ণালী ট্রফি! তাঁর বিদায় তো এমন এক মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়ের মতোই হওয়ার কথা ছিল।

এস্তাদিও মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাস আজ নিশ্চয়ই মেসির পায়ের স্পর্শ খুব মিস করবে। বলটি আজ হয়তো নীরবে এক কোণে পড়ে থেকে ভাববে, হায়! আমাকে ভালোবেসে আর কেউ কি ওভাবে আগলে রাখবে? ফুটবলের এই প্রাঙ্গণ, নীল-সাদা সমর্থক আর পৃথিবীর কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে আজ কেবলই শূন্যতার প্রতিধ্বনি।

​তিনি চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন এমন এক কিংবদন্তিসম ঐতিহ্য, যা যুগ থেকে যুগে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আলো ছড়াবে। লিওনেল মেসি নামক সুরটি হয়তো আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর বাজবে না, কিন্তু সেই সুরের মূর্ছনা থেকে যাবে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মধুর গীতি আলেখ্য হয়ে। বিদায়, ফুটবলের রাজপুত্র! বিদায়, মহাকালের সেরা ঈশ্বরপ্রদত্ত জাদুকর!

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link