সুকুমার রায়কে প্রফেসর হিজিবিজবিজ বলেছিলেন- ষড়াঙ্গুল মহাশয়।
কারণ, লেখক ভদ্রলোকের এক হাতে বাড়তি একটা মিলিয়ে ছয়টা আঙুল ছিল। আমাদের মার্টিন গাপটিলের হাতে বা পায়ে, কোথাও ৬ আঙুল নেই। বরং তার বাম পায়ে আঙুলের রীতিমতো টানাটানি; কেটে ফেলার পর মাত্র দুটো আঙুল আছে। বন্ধুরা তাই বলে-দু আঙুলে; টু টো গাপটিল!
এই দু আঙুলে গাপটিল অবশ্য বিশেষ কেউ ছিলেন না কোনোদিন। তবে, নিউজিল্যান্ডের এক্স ফ্যাক্টর ছিলেন। বড় একটা সময় সার্ভিস দিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেট একটা সময় ছিলেন বিস্ময়কর পারফর্মার। তারপরও একটা নীরবতা তো ছিলই। গাপটিলের ক্যারিয়ার বিজ্ঞাপন অবশ্য এই নীরবতাই। তাঁর কোনো কিছুতেই সোরগোল নেই। তিনি মোটেও মহাতারকা নন।

রোহিত শর্মা, ক্রিস গেইলদের কথা বাদ দিন। তার নিজের দেশ নিউজিল্যান্ডের ব্রেন্ডন ম্যাককালাম বা কেন উইলিয়ামসনের তুলনায়ও তিনি একেবারে লো প্রোফাইল মানুষ। তাকে নিয়ে নিলামের আগে ফিচার হয় না, তার নামের আগে ‘হিটম্যান’ টাইপের কোনো বিশেষণ বসে না। কিন্তু দিনশেষে মার্টিন গাপটিল আজকের এই মারকাটারি ব্যাটিং দুনিয়ার অন্যতম বড় তারকা।
গাপটিল নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটে উঠে এসেছেন যুব ক্রিকেট থেকে। একেবারে ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের সাথে বেড়ে উঠেছেন। তবে ক্রিকেট কেনো, জীবনটাই শেষ হয়ে যেতে পারতো।
মালামাল তোলার একটা গাড়ির নিচে পড়ে গিয়েছিলেন। ভাগ্যক্রমে জীবনটা বেঁচে গেলেও লম্বা সময় হাসপাতালে থাকতে হয়েছিলো এবং বাম-পায়ের তিনটে আঙুল কেটে ফেলতে হয়েছিলো। এই সময় ছেলেকে সাহস দেওয়ার জন্য গাপটিলের বাবা অনেক দৌড়ঝাঁপ করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন তখনকার নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক স্টিভেন ফ্লেমিংকে।

কে জানতো, একদিন সেই ফ্লেমিংয়ের মতোই জাতীয় দলে খেলবেন গাপটিল! ২০০৭-০৮ মৌসুমে স্টেট শিল্ডে সর্বোচ্চ রান করেন এবং অকল্যান্ডকে ফাইনালে তোলেন। এই পারফরম্যান্সই মূলত নির্বাচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। দূরন্ত ফর্মের স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় দলে ডাক পান।
২০০৯ সালে সব ফরম্যাটেই অভিষেক গাপটিলের। টেস্টে খুব ভালো নন। তারপরও ৩টি সেঞ্চুরি আছে এই ওপেনারের। একটা ছোট্ট রেকর্ডও আছে। পিংক টেস্টের ইতিহাসে প্রথম বলটি খেলা ব্যাটসম্যান গাপটিল এবং প্রথম আউট হওয়া ব্যাটসম্যানও তিনি। একটু শক্ত হাতে ব্যাটিং করার প্রবণতার কারণে টেস্টে ভালো করতে পারেন না বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তিনি রীতিমতো রাজা ছিলেন একটা সময়। তবে, ক্যারিয়ারের শেষের দিনগুলোতে নিউজিল্যান্ড দলে বেশ অপাঙতেয় ছিলেন। কিন্তু, রাজা হওয়াই যার ধর্ম, তিনি আর ডাগ আউটে বসে থাকতে রাজি থাকবেন কেন!

দ্য ডাবল সেঞ্চুরিম্যান তাই থেমে গেলেন। পেছনে পড়ে রইল ওয়ানডে অতিমানবীয় এক গাপটিল রূপকথা। ২০১৫ বিশ্বকাপে ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে করা সেই অপরাজিত ২৩৭ রানের ইনিংস বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ। এটা ছিলো বিশ্বকাপে দ্বিতীয় ডাবল-সেঞ্চুরি; প্রথমটা ওই বিশ্বকাপেই গেইল করেছিলেন।
২০১৫ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের ফাইনালে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিলো গাপটিলের ভয়াবহ ফর্ম। ২০১৯ বিশ্বকাপের আগেও এরকম ফর্মে ছিলেন তিনি। কিন্তু বিশ্বকাপে খুব ভালো কিছু করতে পারেননি। এরপর আর খুব বেশি এগোয়নি ক্যারিয়ার।
ক্যারিয়ারের শেষ বেলায় অন্তত এই মার্টিন গাপটিলকে কিংবদন্তি বললে কেউ হয়তো আপত্তি করবে না। তবে, ক্রিস গেইল বা ম্যাককালামের মতো কেনো যেন তিনি ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেটের হটকেক হয়ে উঠতে পারেননি। সেই আক্ষেপ তো থাকবেই। সব পেলে তো নষ্ট জীবন!











