ইব্রাহিম সাগর: হারিয়ে যাওয়া মুরালিধরন

‘মুরালিধরণকে খেলতে গিয়ে আমার একবারও অপরিচিত মনে হয়নি। মনে হয়েছে, নেটে তো রোজই খেলি এরকম বল। কারণ, আমাদের নেটে ছিলো একজন ইব্রাহিম সাগর।’

হঠাৎ করে সেদিন রাতে ইলিয়াস সানি আড্ডায় ইব্রাহিম সাগরের নামটা মনে করলেন।

স্পিনারদের উঠে আসা, হারিয়ে যাওয়া এবং যত্ন নেওয়া প্রসঙ্গে হঠাৎ করে সানি বললেন, ‘আশরাফুলের অভিষেক সেঞ্চুরিটার কথা মনে আছে? বলেন তো ও মুরালিধরণকে অতো সহজে খেলছিলো কী করে?’

সাথে সাথে চমকের মতো নামটা মাথায় এলো।

নামটা তো আশরাফুল নিজেই অনেকবার বলেছেন। এই কিছুদিন আগেও আরেক আড্ডায় বলছিলেন, ‘মুরালিধরনকে খেলতে গিয়ে আমার একবারও অপরিচিত মনে হয়নি। মনে হয়েছে, নেটে তো রোজই খেলি এরকম বল। কারণ, আমাদের নেটে ছিলো একজন ইব্রাহিম সাগর।’

কে এই ইব্রাহিম সাগর? কোথায় আছেন এখন তিনি?

আশরাফুল, এনামুল জুনিয়র থেকে শুরু করে ইলিয়াস সানি; ওই প্রজন্মের ক্রিকেটারদের স্বাক্ষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রথম বৈধ অ্যাকশনে দুসরা করতে পারা বোলার ছিলেন ইব্রাহিম সাগর। সানি আরেক ধাপ এগিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের সেরা স্পিনার হতে পারতো সাগর।’

কিন্তু নিয়তি এক একজন মানুষকে এক এক পথে নিয়ে যায়। সাগর এখন আর ক্রিকেটার নন। ‘উইকেন্ড ক্রিকেট’ ছাড়া এই খেলাটার সাথে তার আর সম্পর্কও নেই। এখন তিনি একটি বহুজাতিক কোম্পানির কর্মকর্তা। দুসরা ছেড়ে এখন মার্কেট অ্যানালাইসিস করেন সাগর!

ওয়াহিদুল গনির ছাত্র ছিলেন।

আশরাফুলদের দারুন প্রতিভাধর সেই ব্যাচটার স্পিনারদের সবারই কেতামাফিক শিক্ষা হয়েছিলো দেশের প্রথম লেগস্পিনার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা ক্রিকেট গুরু ওয়াহিদুল গনির হাতে। ঢাকার সেই সময়ের যারা কিশোর ক্রিকেটার, তারা মনে করতেন, তাদের সবাইকে একদিন ছাপিয়ে যাবে সাগর।

এই সাগর তার সেরা অস্ত্র দুসরাটা রপ্ত করেছিলেন সরাসরি সাকলায়েন মুশতাকের কাছ থেকে।

সাগর নিজেই বলছিলেন, ‘আমরা শুনতাম যে, দুসরা বলে একটা বল আছে, সেটা কেউ খেলতে পারে না। এই ডেলিভারিটা করতে পারে শুধু সাকলায়েন আর মুরালিধরন। ১৯৯৭ সালে আমাদের এখানে যখন ইন্ডিপেন্ডেন্ট কাপ হলো, তখন সাকলায়েনকে কাছে পেলাম। আমরা তখন ছিলাম বলবয়।’

সাকলায়েনের কাছ থেকে সরাসরি দুসরার গ্রিপ, ট্রিকস শিখে নিলেন।

সেটা যে খুব ভালো শিখেছিলেন দু’বছর পর ঢাকায় মিনি বিশ্বকাপের সময় আবারও সাকলায়েন নিজেই দেখে সার্টিফিকেট দিলেন। তখন থেকেই ওই লেভেলের ক্রিকেটে সাগর হয়ে উঠেছিলেন ‘আনপ্লেয়েবল’। সাকলায়েনের শিষ্য হলেও দুর্বোধ্য অ্যাকশনের কারণে সতীর্থদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন মুরালিধরণ। অন্তত সে সময়ের ক্রিকেটাররা তাই বলেন।

আশরাফুল যেমন বললেন, ‘সাগরকে খেলাটা মুরালিধরনকে খেলার মতোই কঠিন ছিলো। ও সে সময়ের সেরা স্পিনারদের একজন ছিলো।’

তিনি বাংলাদেশ জাতীয় অনূর্ধ্ব ১৩, অনূর্ধ্ব-১৫ ও অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে খেললেন। এইসব বয়সভিত্তিক দলে নাফীস ইকবাল, শাহরিয়ার নাফিস, এনাম জুনিয়র থেকে শুরু করে অনেক তারকার সাথেই খেলা হয়ে গেলো।

ঢাকার ক্রিকেটে দ্বিতীয় বিভাগে শুরু করে প্রিমিয়ারে সূর্যতরুনের হয়েও খেলেছেন।

কিন্তু আশরাফুল সেই সেঞ্চুরি করে ফেরার এক বছর পর, ২০০১ সাল থেকেই পথ হারাতে শুরু করেন। ২০০২ সালে শেষ লিগে খেললেন।

নিজেই পেছন ফিরে আর কাউকে দোষ দিতে চান না, ‘আফসোস হয়। টিকে থাকলে হয়তো জীবনটা অন্যরকম হতো। হয়তো নিজেই ঠিক কাজটা করতে পারিনি। যে লড়াইটা করা দরকার ছিলো, তা করতে পারিনি। সব মিলিয়ে ভাবি, আমার ভাগ্যে ছিলো না।’

ভাগ্য পক্ষে ছিলো না বলেই আমরাও মিস করলাম আমাদের নিজেদের মুরালিধরন, ইব্রাহিম সাগরকে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...