অসম্ভবকে সম্ভব করতে ম্যাক্সওয়েল আর ফিরবেন না

যে ব্যাটার অসম্ভব ম্যাচকে সম্ভবের ঘরে এনে ফেলতেন, তাঁর অধ্যায়টা শেষ হলো। ভবিষ্যতে কখনো কোনো ম্যাচ হাত থেকে ফসকে যেতে থাকলে কেউ না কেউ নিশ্চয়ই ভাববে, এই সময়টায় ম্যাক্সওয়েল থাকলে হয়তো ম্যাচের ফলাফল টা পালটে দিতো। 

ম্যাচ হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে। রান রেট আকাশে, ওভার ফুরিয়ে আসছে, উইকেট পড়ছে একের পর এক। গ্যালারিতে শুনশান নীরবতা, ড্রেসিংরুমে সবাই নিজের নখ কামড়াচ্ছে। এই অবস্থায় ক্রিজে যদি থাকেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, তাহলে হিসাবটাই উল্টে যেত, হারা ম্যাচেও মানুষ জেতার স্বপ্ন দেখত, কারণ সবাই জানত এই মানুষটার জন্যে একটা ওভারই যথেষ্ট।

কিন্তু, ওই যে বলে না নক্ষত্রেরও একদিন বিদায় নিতে হয়, সেই পথ ধরেই ‘দ্য বিগ শো’ গ্লেন ম্যাক্সওয়েল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন। ৩৮ বছর বয়সী ম্যাক্সওয়েল গত বছরের জুনে ওয়ানডে ছেড়েছিলেন।

এবার টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিকের পাশাপাশি প্রথম শ্রেণি আর লিস্ট এ ক্রিকেটকেও বিদায় বললেন। ফেব্রুয়ারিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওমানের বিপক্ষে ম্যাচটাই হয়ে রইল তাঁর শেষ ম্যাচ। সেদিন ব্যাট করার সুযোগ পাননি, বল হাতে নিয়েছিলেন দুটি উইকেট। শেষটা যে এমন নীরবে আসবে, তখন হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি।

২০১২ সালে ওয়ানডে দিয়ে শুরু। চোদ্দ বছরে ১৪৯টি ওয়ানডে, ১৩০টি টি-টোয়েন্টি আর সাতটি টেস্ট মিলিয়ে ২৮৬ ম্যাচ খেলেছেন। রান করেছেন ৭ হাজার ২২৬, সেঞ্চুরি ১০টি, ফিফটি ৩৫টি, চার ৬৫৮টি আর ছক্কা ৩১২টি, বল হাতে নিয়েছেন ১৩৬ উইকেট।

গড়ের হিসাবে তাঁকে হয়তো সাদামাটা মনে হবে, কিন্তু ম্যাক্সওয়েলকে কখনো গড় দিয়ে মাপা যায়নি। টি-টোয়েন্টিতে ১৫৪ ছাড়ানো স্ট্রাইক রেটে তাঁর রান ২ হাজার ৮৯৭, আর পাঁচটি সেঞ্চুরির রেকর্ড তিনি ভাগ করে নিয়েছেন রোহিত শর্মার সঙ্গে।

রাঁচিতে ভারতের বিপক্ষে ২০১৭ সালে টেস্টেও সেঞ্চুরি করেছেন, তিন ফরম্যাটেই শতক পাওয়া দেশের দ্বিতীয় ব্যাটার তিনি। ক্রিকেটের নিয়মকানুনের ছক ভেঙে খেলাটাই ছিল তাঁর স্বভাব। কাজী নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার ভাষায়, “আমি চিরদুরন্ত দুর্মদ, আমি দুর্দম”, ম্যাক্সওয়েলের ব্যাটিংয়ের সঙ্গে লাইনটা যেন অদ্ভুতভাবে মিলে যায়।

বড় ম্যাচে দলকে জেতানোর কাজটা তিনি বারবার করেছেন। ২০১৫ আর ২০২৩ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ, ২০২১ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, তিনটিই জিতেছেন। টি-টোয়েন্টি ফাইনালে জয়ের রানটাও এসেছিল তাঁর ব্যাট থেকে। তবু তাঁর কথা উঠলেই আগে মনে পড়ে ২০২৩ বিশ্বকাপে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সেই রাত।

৯১ রানে ৭ উইকেট পড়ে গেছে, ম্যাচ প্রায় শেষ। পায়ে ক্র্যাম্প, দাঁড়িয়ে থাকাই কঠিন। সেই অবস্থায় ম্যাক্সওয়েল খেললেন ১২৮ বলে অপরাজিত ২০১ রানের ইনিংস। যে ম্যাচ সবাই হেরে যাওয়া ধরে নিয়েছিল, সেটা একাই জিতিয়ে দিলেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন ইনিংস হাতে গোনা, আর ওই রাতের ছবি ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখে এখনো ভাসে।

বিদায়টা অবশ্য তাঁর মনের মতো হয়নি। ইংল্যান্ড সিরিজে মেলবোর্নে একটি টি-টোয়েন্টি আছে, নিজের ঘরের মাঠ এমসিজিতে শেষবার নামার ইচ্ছা ছিল। ফাইনাল ওয়ার্ড পডকাস্টে তিনি বলেছেন, ‘এমসিজিতে একটা বিদায়ী ম্যাচ পাওয়ার ছোট্ট একটা আশা বা আলোচনা ছিল। কিন্তু দল যেদিকে যাচ্ছে, সেটা আমি পুরোপুরি বুঝতে পারি।’

২০২৮ সালের অলিম্পিকের আগে তরুণদের আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে পরখ করে নিতে চায় দল, সেই যুক্তিও তিনি মেনে নিয়েছেন। টি-টোয়েন্টি নিয়ে তাঁর কথায় ছিল বাড়তি আবেগ, ‘এই ফরম্যাট ছাড়া আর কোনো ফরম্যাটে আমি হয়তো এটা চাইতাম না, গত ১৫ বছরে এটা প্রায় ঘরের মতো লেগেছে।’

ভিক্টোরিয়ার হয়ে শেষ ওয়ানডে খেলার পর সতীর্থদের কথাটা জানাতে গিয়ে গলা ধরে এসেছিল তাঁর। এখন হাঁটুর যত্নে আট সপ্তাহের রিহ্যাবে আছেন, লক্ষ্য বিগ ব্যাশ। মেলবোর্ন স্টার্সের সঙ্গে চুক্তি আছে ২০২৭-২৮ মৌসুম পর্যন্ত, তাই ঘরোয়া মাঠে তাঁকে আরও কিছুদিন দেখা যাবে। শুধু জাতীয় দলের জার্সিতে আর নয়।

যে ব্যাটার অসম্ভব ম্যাচকে সম্ভবের ঘরে এনে ফেলতেন, তাঁর অধ্যায়টা শেষ হলো। ভবিষ্যতে কখনো কোনো ম্যাচ হাত থেকে ফসকে যেতে থাকলে কেউ না কেউ নিশ্চয়ই ভাববে, এই সময়টায় ম্যাক্সওয়েল থাকলে হয়তো ম্যাচের ফলাফল টা পালটে দিতো।

Share via
Copy link