নেইমার, এক যুবরাজের আর্তনাদ

কেউ দেখেনি, প্রতিটি ড্রিবলের পর কতটা ব্যথা জমে থাকত তার গোড়ালিতে। কেউ দেখেনি, মাঠের বাইরে কত রাত তিনি কাটিয়েছেন নিজের শরীরকে বোঝাতে, 'আরেকবার। আরেকবার কি তুমি পারবে না দৌড়তে?

অসহনীয় এক ব্যথা, অভিশাপের সিলমোহর বুকে নিয়ে যন্ত্রণায় মধ্যরাতে কাতরে ওঠেন তিনি। নীল আকাশের নিচে বসে যিনি সব ঠিক করেন। অভিমানি চোখে তাঁর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকা আর অস্ফুট স্বরে বলা, ‘আর একবার, শেষবারের মতো একবার।’ ফুটবল সাম্রাজ্যের যুবরাজের হৃদয় চিড়ে বের হয় যন্ত্রনা।

গেল তিন বছর ধরে নেইমার জুনিয়রের সময় গেছে এভাবেই, যেখানে প্রতিটা সেকেন্ডে বেদনাগুলো কুড়ে কুড়ে খেয়েছে। প্রতি মুহূর্তে মনে হয়েছে সেরা হওয়াটাও যেন একটা অভিশাপ। তবে, সেই শাপমোচনের সময়টা এসে গেছে,

কত প্রতিভাই তো জন্ম নিয়েছে। কত প্রতিভাই তো হারিয়ে গেছে, অন্ধকার কোনো সন্ধ্যা গ্রাস করে নিয়েছে তাদের। একটা সময় ব্রাজিলের রাস্তাগুলো বিশ্বাস করত, তাদের নতুন রাজা এসে গেছে। সান্তোসের সেই ছেলেটা যখন বল পায়ে নাচত, মনে হতো ফুটবল আবার নিজের সবচেয়ে সুন্দর ভাষাটা খুঁজে পেয়েছে।

নেইমার তো কেবল একজন ফুটবলার ছিলেন না। অমৃত প্রতিভার সমুদ্র নিহিত ছিল তাঁর মাঝে, নিহিত ছিল রক্তিম আকাশের সমস্তটুকু সৌন্দর্য। তিনি ছিলেন ব্রাজিলের স্বপ্ন। পেলের পর জন্ম নেওয়া সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতি। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোই বোধহয় সবচেয়ে বেশি অন্ধকার টেনে আনে।

নেইমার যখন বড় হতে শুরু করলেন, আশপাশ থেকে প্রত্যাশাগুলো দানবীয় রূপ ধারণ করল। ও বিশ্বসেরা, ও দুনিয়া শাসন করবে, করতেই হবে। প্রতিটি ম্যাচে তাঁকে অলৌকিক কিছু করতে হবে, প্রতিটি টাচে জাদুকরী কিছু দরকার। এমন সব শব্দগুচ্ছ যখন কানে এসে বাজল, ছেলেটা নিষ্ঠুর কালচক্রে আটকে গেল তখন। আর সেই জাদুর মূল্যটা দিচ্ছিল তার শরীর।

কেউ দেখেনি, প্রতিটি ড্রিবলের পর কতটা ব্যথা জমে থাকত তার গোড়ালিতে। কেউ দেখেনি, মাঠের বাইরে কত রাত তিনি কাটিয়েছেন নিজের শরীরকে বোঝাতে, ‘আরেকবার। আরেকবার কি তুমি পারবে না দৌড়তে? পারবে না প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে চুরমার করে দিতে?’

কখনো সেটা হয়েছে, কখনো নিজের শরীরটাই চুরমার হয়েছে ইনজুরির রোখরাঙানি উপেক্ষা করতে গিয়ে। প্রতিভা আর যন্ত্রণা একসাথে নিয়ে বেঁচে থাকা কষ্টেরই।

বিশ্বকাপের পর বিশ্বকাপ যায়, অধরা ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখা হয় না। গল্পের ক্লাইম্যাক্সে এসে জিতে যায় অদৃশ্য কোনো ভিলেন। নায়ক হয়েও যেন রোলটা ঠিকঠাক মেলে না তাঁর। বারবার বনে যেতে হয় ট্রাজিক হিরো। হেরে যাওয়া নায়কদের মনে রাখে ক’জন?

তাই তো একসময় পৃথিবী ধীরে ধীরে তাঁকে ভুলতে শুরু করল। ইউরোপের আলো থেকে দূরে সরে গেলেন তিনি। সমালোচকরা বলল এবার সব শেষ। কিন্তু একটা জিনিস তারা বুঝতে পারেনি। কিছু মানুষকে সময় হারাতে পারে না। আর নেইমার ঠিক তেমনই এক নাম।

তিন বছর ধরে তিনি অপেক্ষা করেছেন। নিজের শরীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। হয়তো অসংখ্য রাত কেটেছে পুনর্বাসনের নিঃশব্দ ঘরে, যেখানে করতালি নেই, ক্যামেরা নেই, আছে শুধু ফিরে আসার ক্ষুধা।

সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে। হলুদ জার্সিটা আরও একবার ঘুরে তাকিয়েছে তাঁর দিকে। আবারও বলটা পায়ের প্রেমে পড়বে, সান্তোসের বুকে শোনা যাবে, ‘নেইমার, হোক না আর একবার।’

২০২৬ বিশ্বকাপ, হয়তো এটা তাঁর শেষ। হয়তো এটাই শেষবার, পৃথিবী তাকে দেখবে হলুদ জার্সি গায়ে প্রতিপক্ষের প্রাচীর ভেঙে চুরমার করতে। নেইমার যে ফিরে এসেছেন, নিজের ভেতরের অভিশপ্ত দানবকে পরাজিত করে, ফিরে এসেছেন বিশ্ব আসরে। এবার কি মূল নায়ক হতে পারবেন? ভাগ্যদেবতা কি কান পেতে শুনেছেন বিস্ময়কর যুবরাজের আর্তনাদ?

লেখক পরিচিতি

স্টাফ রিপোর্টার

Share via
Copy link