বল হাতে দৌড়ে আসছেন জহির খান। তারপর সেই লাফ। বাঁহাত থেকে ছুটে আসছে বল। কখনও সুইং করে বাইরে যাচ্ছে, কখনও শেষ মুহূর্তে ভেতরে ঢুকে স্টাম্প ছিটকে দিচ্ছে। একটা সময় ছিল, ভারতীয় ক্রিকেটে এই দৃশ্যটা ছিল খুব পরিচিত। জহির খান মানেই ছিল ভরসা।
গ্রেগ চ্যাপেলের কোচিংয়ের সময় চোট আর নানা কারণে কিছুদিন দলের বাইরে ছিলেন। সেই সময়টুকু বাদ দিলে পরের প্রায় ১৪ বছর ভারতের পেস আক্রমণকে অনেকটা একাই টেনে নিয়ে গেছেন তিনি।
এই সময়ে ভারতীয় দলে এসেছেন অনেক পেসার। আশিষ নেহরা, অজিত আগরকার, শান্তাকুমারণ শ্রীসন্থ, মুনাফ প্যাটেল, ইরফান পাঠান, রুদ্রপ্রতাপ সিং। কেউ এসেছেন, কেউ হারিয়ে গেছেন, কেউ আবার ফিরে এসেছেন। কিন্তু জহির ছিলেন। তিনি ছিলেন একটা সুদৃঢ় স্তম্ভের মতো।
সময় বদলেছে। ভারতীয় ক্রিকেট বদলেছে। ব্যাটসম্যানরা বদলেছেন। কিন্তু জহির নিজের বোলিংকেও বদলে নিয়েছেন সময়ের সঙ্গে।

শুরুর দিকে ছিল গতি। তারপর যোগ হলো সুইং। এরপর নিখুঁত ইয়র্কার। আর ক্যারিয়ারের পরের দিকে রিভার্স সুইং হয়ে উঠল তাঁর অন্যতম বড় অস্ত্র। ব্যাটসম্যানের জন্য জাহিরের একেকটা স্পেল ছিল একেকটা ধাঁধা।
ভারতীয় ক্রিকেট যখন বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের নতুন পরিচয় তৈরি করছিল, সেই গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন জহির খান। ২০০৩ থেকে টানা তিনটা বিশ্বকাপ খেলেন তিনি। আর শেষবার যখন বিশ্বকাপ খেললেন, তখন হাতে উঠল ট্রফি।
২০১১ বিশ্বকাপে ভারতের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে জহিরের অবদান ছিল বিশাল। কঠিন সময়ে তাঁর হাতে বল তুলে দেওয়া হতো। আর তিনি বারবার সেই বিশ্বাসের উত্তর দিয়েছেন উইকেট দিয়ে।
২৩টি বিশ্বকাপ ম্যাচ। ৪৪টি উইকেট। টেস্টে ৯২ ম্যাচে ৩১১ উইকেট। সঙ্গে ১২৩০ রান। এক ইনিংসে সেরা ৭ উইকেট, ৮৭ রানে। ম্যাচে ১০ উইকেট, ১৪৯ রান হজম করে। ব্যাট হাতেও তাঁর একটা গল্প আছে। টেস্টে সর্বোচ্চ ৭৫ রানের একটা ইনিংস খেলেন বাংলাদেশের বিপক্ষে।

ওয়ানডেতে ২০০ ম্যাচে ২৮২ উইকেট। সেরা বোলিং ৫ উইকেট ৪২ রানে। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ১৭ ম্যাচে ১৭ উইকেট। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৬১০ উইকেট।
কিন্তু জহির খানকে কি শুধু এই সংখ্যাগুলো দিয়ে বোঝা যায়? সম্ভবত না। কারণ একটা প্রজন্মের কাছে জাহির খান মানে শুধু একজন বোলার ছিলেন না।
তিনি ছিলেন একটা সময়ের প্রতিচ্ছবি। বল ডেলিভারির আগে সেই দুরন্ত লাফটা আজও মনে পড়ে। কী অদ্ভুত একটা দৃশ্য ছিল! ওই লাফের মধ্যে যেন একটা আত্মবিশ্বাস ছিল। ছিল একটা নতুন ভারতের গল্প। গড়াপেটার অন্ধকার পেরিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট তখন নতুন করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
সৌরভ গাঙ্গুলি, শচীন টেন্ডুলকার, রাহুল দ্রাবিড়দের নেতৃত্বে একটা নতুন দল তৈরি হচ্ছে। সেই দলে কয়েকজন তরুণ প্রতিভা নিজেদের সবটুকু দিয়ে বদলে দিতে চেয়েছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের চেহারা। জহির খান ছিলেন তাঁদেরই একজন। সেই সময় ভারত শুধু ব্যাটিংয়ের ওপর নির্ভর করে থাকতে চাইছিল না।

তারা চাইছিল এমন পেস বোলিং, যারা ম্যাচ জেতাতে পারে। বিশ্বের বড় দলগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়তে পারে। আর সেই যাত্রায় জহির খান ছিলেন সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া সৈনিক।
আজ জহিরের হাতে নতুন বল নেই। নেই সেই দীর্ঘ রানআপ। নেই ডেলিভারির আগে সেই দুরন্ত লাফ। কিন্তু পুরোনো ভিডিওতে যখন আবার তাঁকে দৌড়ে আসতে দেখি, একটা সময় যেন ফিরে আসে।
একটা প্রজন্ম ফিরে আসে। ফিরে আসে সেই ভারত, যারা তখন নতুন করে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের জায়গা বানাচ্ছিল। আর সেই গল্পে একটা বাঁহাতি পেসার ছিলেন। নাম তাঁর জহির খান। যাঁর লাফটা আজও নিশ্চয়ই ভারতীয় ক্রিকেট খুব মিস করে।










