জাকার্তার যখন আরিফ আইমানের পা থেকে বল জালে জড়াচ্ছিল একের পর এক, তখন বাংলাদেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর বুকে হয়তো একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল, এই হারের শেষ কোথায়?
১৩৬ নম্বরে থাকা মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ১৮১ নম্বরে থাকা বাংলাদেশ হারল ৩-০ গোলে। ১৮ মিনিটে আইমানের প্রথম গোল, ৩৭ মিনিটে দ্বিতীয়টাও তার পা থেকেই। বিরতির পর ৫২ মিনিটে ব্যবধান বাড়ান ব্রাজিল থেকে উড়ে আসা বার্গসন। পুরো ম্যাচে বাংলাদেশের শট মোটে সাতটা, লক্ষ্যে দুটো। উল্টোদিকে মালয়েশিয়ার তেরোটা শটের সাতটাই ছিল লক্ষ্যে। বল দখলেও এগিয়ে তারা, মাঠের প্রতিটা মুহূর্তে যেন স্পষ্ট হচ্ছিল একটা কথা, মান আর প্রস্তুতির ফারাক ঠিক কতটা গভীর।
অথচ ফুটবলই তো ছিল এই দেশের প্রথম প্রেম। ক্রিকেটের চেয়ে অনেক বেশি পুরনো এই খেলার শেকড়, অনেক গভীর এর সংস্কৃতি। তাহলে কীভাবে ক্রিকেট এগিয়ে গেল এত দূর, আর ফুটবল থমকে রইল সেই জায়গাতেই?

উত্তরটা লুকিয়ে আছে ১৯৯৭ সালের এক বিকেলে। মালয়েশিয়ার মাটিতে আইসিসি ট্রফির ফাইনালে কেনিয়াকে হারিয়ে শিরোপা জেতে বাংলাদেশ, সেই জয় খুলে দেয় ১৯৯৯ বিশ্বকাপের দরজা।ইংল্যান্ডের সেই বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডকে হারানোর পর নর্থাম্পটনে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই অবিশ্বাস্য জয়, যা রাতারাতি বদলে দেয় ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান। ২০০০ সালের ২৬ জুন টেস্ট মর্যাদা পায় দেশ, সেই বছরই নভেম্বরে ঢাকায় ভারতের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সেই দুর্দান্ত ১৪৫ রানের ইনিংস, যা এখনও রূপকথার মতো শোনায়।
এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিই খুলে দেয় বিদেশি কোচ, বিশাল স্পন্সর আর বিশ্ব ক্রিকেটের দুয়ার, ফুটবল সেই সুযোগ কখনও পায়নি। বিশ্বমঞ্চে বড় কোনো সাফল্য ছাড়া মনোযোগ পাওয়া যায় না, স্পনসরও আসে না। ক্রিকেটে যখন এসেছে আইসিসির উন্নয়ন তহবিল, ভালো অবকাঠামো, শক্তিশালী ঘরোয়া কাঠামো, তখন ফুটবল খুঁজেছে টিকে থাকার পথ একরকম নিজের চেষ্টাতেই।
মাঠপর্যায়ে গেলে ছবিটা আরও স্পষ্ট, আজ কোনো কিশোর ক্রিকেটার চাইলেই খুঁজে পায় ক্লাব, কোচিং, স্কুল আর জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতার সিঁড়ি, যা তাকে ধীরে ধীরে এগিয়ে দেয় জাতীয় দলের দিকে। ফুটবলে সেই সিঁড়িটাই যেন অসম্পূর্ণ। অনেক এলাকায় নেই সংগঠিত ক্লাব বা একাডেমি। অসংখ্য প্রতিভাবান কিশোর বেড়ে ওঠে রাস্তায়, মাঠে, নিজের চেষ্টায়, কিন্তু আধুনিক কৌশল, পজিশনিং কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার শিক্ষা ছাড়াই। যেই মুহূর্তে তারা মুখোমুখি হয় শক্তিশালী কাঠামোর দেশগুলোর সঙ্গে, সেই ফারাকটা তখন আর লুকানো যায় না।

জাকার্তার মাঠে যা দেখা গেল শুক্রবার, সেটা তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের ফুটবলের ব্যর্থতারই চিত্র।!
তবে চেষ্টাটা যে একেবারেই হচ্ছে না, তা বলা যাবে না। নামী কোচ আনা হচ্ছে, বিদেশ থেকে খুঁজে আনা হচ্ছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের, যাদের অনেকেই এখনও জুনিয়র পর্যায়ে। জামাল ভূঁইয়া আসার পর বিশ্ব ফুটবল যেভাবে চিনতে শুরু করে বাংলাদেশকে, হামজা চৌধুরীর অভিষেকের পর সেই পরিচিতি বেড়েছে আরও কয়েক গুণ। এরপর একে একে আসছেন আরও অনেকে। কিন্তু মাঠের ফলাফলে সেই ছাপ এখনও পড়েনি, আশিয়ান কাপ বা বড় টুর্নামেন্টে বলার মতো কিছু এখনোও করতেই পারেনি বাংলাদেশ।
রাতারাতি তৈরি হয়নি এই দূরত্ব, রাতারাতি মিটবেও না, হয়তো একদিন ক্রিকেটের মতো ফুটবলেও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের নাম লিখতে পারবে বাংলাদেশ। প্রশ্ন শুধু একটাই, সেই অপেক্ষার প্রহর কতদিনের।












